পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি নেই
তবু শঙ্কা ৫ জনুয়ারি কি না?
আজ সেই আলোচিত ৫ জানুয়ারি। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের তিন বছর পূর্তি। একদিকে যেমন ক্ষমতাসীন দল দিনটিকে ‘গণতন্ত্রের বিজয় দিবস’ হিসেবে পালন করছে; তেমনি ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ হিসেবে পালন করছে সংসদের বাইরে থাকা বিএনপি। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের পর থেকেই প্রতি বছর দিবসটি ঘিরে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি পালন করে আসছে দল দুটি। দিনটি ঘিরে রাজনীতিতে দেখা দিচ্ছে উত্তেজনা। আতঙ্কে পড়ছে সাধারণ মানুষ। দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা।
দিনটি ঘিরে দেখা দেওয়া উদ্বেগের শুরু প্রথম বছর পূর্তিতে ২০১৫ সালে। সে নির্বাচন বয়কট করা বিএনপি সে বছরের ৫ জানুয়ারি দিনটিকে ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ আখ্যায়িত করে রাজধানীতে সমাবেশ করতে চায়। কিন্তু সরকারের বাধায় সমাবেশ তো দূরের কথা রাজপথেই নামতে পারেননি দলের নেতাকর্মীরা। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে তার গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে আটকে দেয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। প্রতিবাদে সারা দেশে অনির্দিষ্টকালের হরতাল-অবরোধের কর্র্মসূচি ঘোষণা করেন তিনি। উত্তাল হয়ে ওঠে দেশ। রাজধানী ঢাকা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। অবরোধের নামে দেশজুড়ে টানা তিন মাস তান্ডব চালায় বিএনপি-জামায়াত জোট। পেট্রলবোমা ও গাড়িতে অগ্নিসংযোগসহ বর্ণনাতীত সে নৈরাজ্যে প্রাণ হারান শতাধিক মানুষ। আহত ও পঙ্গুত্ববরণ করতে হয় অনেককে। এক দুঃসহ জীবন পাড়ি দেয় দেশবাসী।
বিএনপি-জামায়াতের সেই তান্ডব এড়াতে অবশ্য ২০১৬ সালের ৫ জানুয়ারি দ্বিতীয় বছর পূর্তির দিনে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ করার অনুমতি দেওয়া হয় বিএনপিকে। দলীয় প্রধান খালেদা জিয়া এদিন অস্থায়ী মঞ্চে বক্তব্য রাখেন। সংঘাত-সংঘর্ষ থেকে রক্ষা পায় মানুষ। কিন্তু পেট্রলবোমায় মানুষ পুড়িয়ে মারার ঘটনায় রাজনৈতিকভাবে ভীষণ কোণঠাসা হয়ে পড়ে বিএনপি। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে সাধারণ মানুষ থেকে। দলগতভাবে চরম বিপর্যয় দেখা দেয়। অদ্যাবধি সেই ধকল সামলে উঠতে পারেনি বিএনপি। আর যুদ্ধাপরাধের বিচারসহ সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের কারণে এখন নিশ্চিহ্নপ্রায় জামায়াতে ইসলামী।
এ বছরও ৫ জানুয়ারি ঘিরে গত এক সপ্তাহজুড়েই দেশজুড়ে চলছে এক ধরনের চাপা উত্তেজনা। দিনটি ঘিরে দুই প্রধান রাজনৈতিক দল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও সংসদের বাইরে থাকা বিএনপির ঘোষিত পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দেখা দিয়েছে উদ্বেগও। প্রতি বছর কেবল ৫ জানুয়ারির দিকে মনোযোগ থাকলেও এবার ৫ ও ৭ জানুয়ারি পৃথক কর্মসূচি ঘোষণা দেওয়ায় মাঝখানের দিনসহ তিন দিনের আতঙ্কে পড়েছে মানুষ। বিশেষ করে শেষের দিন অর্থাৎ ৭ জানুয়ারি রাজধানীতে বিএনপি সমাবেশ ডাকায় সবার দৃষ্টি এখন সেই দিনেই। ৫ জানুয়ারি দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিশেষ আদালতে হাজিরার দিন ধার্য থাকায় দুদিন পর ৭ জানুয়ারি রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশের ঘোষণা দিয়েছে দলটি।
যদিও দুদলই কৌশলী কর্মসূচি দিয়েছে এবং প্রথম বর্ষপূর্তির তুলনায় বিএনপির পরিস্থিতি অনেকটাই নাজুক হওয়ায় প্রথম বছরের মতো সহিংসতার কোনো আশঙ্কাও দেখছেন না কেউ; কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের ‘বিএনপিকে কিছুতেই মাঠে নামতে দেওয়া হবে না’—এমন মন্তব্যে উত্তেজনা বেড়েছে। অপরদিকে যেকোনো উপায়ে বিএনপিও কর্মসূচি পালন করার ঘোষণা দেওয়ায় রীতিমতো মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দল দুটি। যদিও রাজনৈতিকভাবে এ মুহূর্তে আওয়ামী লীগ অনেক বেশি শক্তিশালী ও মাঠের রাজনীতির পুরোটাই এই দলের কব্জায়; তবু শাসক দলের বাড়াবাড়িতে বিএনপি বেঁকে বসলে সেই কর্মসূচি ঘিরে শেষ পর্যন্ত যেকোনো সহিংস ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে রাজনৈতিক মহলসহ সাধারণ মানুষের নজরও আজ আওয়ামী লীগ-বিএনপির দিকে। প্রথম বছরের মতো এবারো কি দেশ সেই জ্বালাও-পোড়াও রাজনীতির শিকার হতে যাচ্ছে; নাকি গত বছরের মতো শেষ পর্যন্ত সব উত্তেজনা কাটিয়ে শান্তিপূর্ণভাবেই কর্মসূচি পালন করবে দল দুটিÑএ প্রশ্ন এখন সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে।
অন্য বছরের তুলনায় এ বছর অবশ্য কর্মসূচিতে ভিন্নতা এনেছে দুদলই। আজ বিএনপি বিভিন্ন জেলায় কালো পতাকা মিছিল করবে। আর আওয়ামী লীগ পৃথক দুটি সমাবেশ করবে রাসেল স্কয়ার ও বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে। ফলে অন্তত কর্মসূচি ঘিরে কোনো ধরনের সংঘর্ষের আশঙ্কা নেই বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, দুপক্ষই রাজনৈতিক শিষ্টাচার বজায় রাখলে শান্তিপূর্ণভাবেই কর্মসূচি পালিত হবে।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. নুরুল আমিন বেপারী বলেন, বিএনপির যে কর্মসূচি তা দেখে মনে হচ্ছে এর চেয়ে বেশি করার কিছু নেই। তারা সংসদের বাইরে আছে। বিগত দিনে তারা ৫ জানুয়ারি নির্বাচন কেন্দ্র করে কর্মসূচি পালন করা নিয়ে পেছনে চলে গেছে। তারা ৫ জানুয়ারির নির্বাচন প্রতিহত করতে গিয়ে কর্মসূচি পালনে মানুষের জানমালের ক্ষতিসহ সম্পদহানি করেছিল। এতে তাদের কোনো রানৈতিক লাভ হয়নি, বরং দেশের মানুষের বিরাগভাজন হয়েছে। এবারও তারা যদি শাসক দলের সঙ্গে আপস করে শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালন না করে তাহলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হয়তো তাদের কঠোর হস্তে মোকাবিলা করবে। তার পরও উভয় দলের ঘোষিত কর্মসূচিতে আপাতত মনে হচ্ছে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়ই ৫ জানুয়ারির কর্মসূচি পালনে কৌশলী ভূমিকা গ্রহণ করেছে।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করে বিএনপিসহ অধিকাংশ নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল। একতরফা ওই নির্বাচনে জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ টানা দ্বিতীয়বার সরকার গঠন করে। এর পর থেকে প্রতি বছর বিএনপি দিনটিকে ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ আর আওয়ামী লীগ ‘গণতন্ত্রের বিজয় দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছে। ২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি পরস্পরবিরোধী অবস্থান নেয়। ওই সময় বেশ কয়েক দিন দেশ অচল হয়ে পড়ে। হিংসাত্মক কর্মকান্ডে সারা দেশে শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটে। প্রায় তিন মাস পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। তবে ২০১৬ সালে দিনটি ঘিরে উত্তেজনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত দুদলই শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালন করে।
আওয়ামী লীগের দুই সমাবেশ : আজ রাজধানীতে দুটি সমাবেশ ও জেলা-উপজেলায় সমাবেশ করবে দলটি। এ ছাড়া এমপিদের নেতৃত্বে ৩০০ নির্বাচনী এলাকায় বেলা সাড়ে ৩টায় একযোগে আনন্দ মিছিল, বর্ণাঢ্য বিজয় শোভাযাত্রা ও সমাবেশ করার কথা রয়েছে। আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্ট নেতারা জানান, ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের বর্ষপূর্তি সামনে রেখে যাতে বিরোধী জোট কোনো নাশকতা করতে না পারে, সে লক্ষ্যে সতর্ক দৃষ্টি রাখা হচ্ছে। এ ছাড়া আনন্দ মিছিলে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্ব ও পরবর্তী সময়ে বিএনপি-জামায়াত জোটের ভয়াল নারকীয় সহিংসতা ও মানুষ হত্যার ঘটনা ভিডিও প্রদর্শন, পোস্টার-লিফলেটের মাধ্যমে দেশবাসীর সামনে তুলে ধরা হবে। কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগ ধানমন্ডির রাসেল স্কয়ার ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে সমাবেশ করবে। এসব কর্মসূচিতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত থাকবেন। এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, ‘৫ জানুয়ারি নির্বাচন না হলে গণতন্ত্র নস্যাৎ হয়ে যেত। এ নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা গণতন্ত্র রক্ষা করেছি। এ কারণেই বিএনপি আজ কথা বলতে পারছে। কর্মসূচি পালন করতে পারছে। ওইদিন নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে তারা ভুল করেছে। নির্বাচনের আগে ও পরে বিএনপি যেভাবে জ্বালাও-পোড়াও করেছে, যেভাবে মানুষ হত্যা করেছে; তাতে দেশের জনগণ আগামী দিনে তাদের এ ধরনের কোনো কর্মসূচি পালন করতে দেবে না।’ আর ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ বলেন, ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বর্ষপূর্তির দিন রাজধানীতে জনস্রোত নামবে। বিশাল ও স্মরণকালের শোডাউন করতে সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে।
মাঠে থাকবে বিএনপিও : দলের দেশের জেলা-উপজেলা পর্যায়ে কালো পতাকা মিছিল করার কর্মসূচি রয়েছে। কর্মসূচি পালনে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে বিএনপির জেলা-উপজেলা পর্যায়ের নেতাদের কর্মসূচি পালনের দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সবাইকে কালো পতাকা নিয়ে ‘শান্তিপূর্ণ’ কর্মসূচি পালনের বার্তা পাঠানো হয় কেন্দ্র থেকে। কেন্দ্রীয়ভাবেও কর্মসূচি পালনে ঢাকা মহানগর বিএনপি প্রস্তুতি নিচ্ছে। অবশ্য বিএনপি দিনটি উপলক্ষে ৭ জানুয়ারিতে প্রধান কর্মসূচি হিসেবে সমাবেশ রেখেছে। এ প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আমাদের কর্মসূচি হবে গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ। আশা করি, সরকার তাতে বাধা দেবে না।’
সূত্র জানায়, আজ কর্মসূচিতে বিএনপি কোনো সংঘাতপূর্ণ কর্মকাণ্ডে জড়াবে না। শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালনের সর্বাত্মক চেষ্টা করবে। ৭ জানুয়ারি রাজধানীতে সমাবেশের অনুমতি না পেলে জোর করে কর্মসূচি পালন করার চিন্তাও নেই দলটির। প্রয়োজনে কর্মসূচি পালন করতে না দেওয়ার অভিযোগ এনে সংবাদ সম্মেলন করতে পারে দলটি। সে ক্ষেত্রে সারা দেশে আরও এক দিন যোগ হতে পারে বিক্ষোভ সমাবেশ কর্মসূচি।
No comments:
Post a Comment