Wednesday, January 4, 2017

নারী উন্নয়নের মাইল ফলকে বাংলাদেশ

গত চার দশকে নারী উন্নয়নের ধারাটি যদি লক্ষ করা যায়, তাহলে দেখা যাবে—বাংলাদেশের নারীরা অনেক দূর অগ্রসর হয়েছে। উন্নয়নের মূলধারাতেই ঘটেছে এই অগ্রগতি। তবে যতটা প্রত্যাশিত ছিল, ততটা ঘটেনি। কখনও বিভ্রান্তিকর রাষ্ট্রীয় নীতিমালা গ্রহণ, কখনও নীতিমালা প্রণয়ন বা পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার আশ্রয় নেওয়া—নানা কারণে নারী উন্নয়নের গতি শ্লথ হয়ে পড়ে, যদিও নারী উন্নয়নে সাড়া জেগেছে, বেড়েছে সচেতনতা, সেইসঙ্গে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে চলছে নারী উন্নয়ন। নারী উন্নয়নের এই গতি আসে মূলত ১৯৯৫ সালে, বেইজিং চতুর্থ বিশ্ব নারী সম্মেলনের পর।
ওই সম্মেলনে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১৮৯টি দেশ নারী উন্নয়নের ১২টি ক্ষেত্র চিহ্নিত করে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করে। বেইজিং ঘোষণার পাশাপাশি জাতিসংঘের উদ্যোগে ২০০০ সালে শতাব্দী উন্নয়নের লক্ষ্য (মিলেনিয়াম গোল) ঘোষণা করা হয়। সেই লক্ষ্যের সঙ্গে মিলিয়েও নারী উন্নয়ন সাধনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। নারী উন্নয়নের পথে যে ১২টি সমস্যা চিহ্নিত করা হয়, দারিদ্র্যের স্থান তার শীর্ষে। নারী উন্নয়নের প্রধান বাধাই হচ্ছে দারিদ্র্য। অর্থনীতিবিদদের মতে, দারিদ্র্য বহুমাত্রিক। নারীর ক্ষেত্রে দারিদ্র্য জেন্ডারমাত্রার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। শুধু নারী হওয়ার কারণে দরিদ্রদের মধ্যে নারীর অবস্থান দরিদ্রতর। বাংলাদেশ বিগত কয়েক দশকে নারীর দারিদ্র্য দূর করতে গ্রহণ করেছে বিভিন্ন পদক্ষেপ। আইনি সংস্কারের মাধ্যমে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে নারীর প্রবেশাধিকার ও অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, শ্রমবাজারের সম্প্রসারণ ও সংরক্ষণের হার বৃদ্ধি করে কৃষি খাত এবং অন্যান্য চাকরিতে নারীকে অধিক মাত্রায় আকৃষ্ট করা।
এদিকে নারী উন্নয়নে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধির মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টির মাধ্যমে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, ঋণসুবিধা প্রদান করে মাঝারি ও কুটির শিল্পে নারী উদ্যোক্তার অংশগ্রহণ। বাজেটে নারীর জন্য পৃথকভাবে সামাজিক নিরাপত্তার (আর্থিক) ব্যবস্থা করা, নারীর আয় বৃদ্ধি সংক্রান্ত নানা রকম ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। ফলে দারিদ্র্যের হার হ্রাস পেয়েছে। আরেকটি যে অগ্রগতি সাধিত হয়েছে, তা হলো সরকারের জেন্ডার সংবেদনশীল বার্ষিক বাজেট প্রণয়ন। কিন্তু এসব ইতিবাচক অগ্রগতি সত্ত্বেও বিদ্যমান বেশ কিছু সমস্যা নারীর দারিদ্র্য দূরীকরণে বাধা সৃষ্টি করছে। শ্রমবাজারের যেসব কাজে উঁচুমাত্রার দক্ষতা দরকার, উপযুক্ত প্রশিক্ষণের অভাবে নারী শ্রমবাজারের সেই অংশে প্রবেশাধিকার পাচ্ছে না। সামাজিক নিরাপত্তার অভাবে নারীর চলাচল সহজ না হওয়ায় পেশাগত জীবনে সাফল্য অর্জন করতে পারছে না। ব্যাংকগুলো নারীকে ঋণ দেয়ার ব্যাপারে অনীহা প্রকাশ করে।
তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি এবং অন্যান্য তথ্যভান্ডারে নারীর প্রবেশাধিকার একেবারেই সীমিত। বাংলাদেশে এখনও সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে ৩৮.৭ শতাংশ মানুষ। নারী উন্নয়নের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রটি হচ্ছে, নারী শিক্ষা ও নারীর প্রশিক্ষণ। নারীর ক্ষমতায়ন ও জেন্ডার সমতা অর্জনে বেইজিং-পরবর্তী বিগত দেড় দশকে বাংলাদেশ শিক্ষাক্ষেত্রে যে অগ্রগতি অর্জন করেছে, তাও উল্লেখযোগ্য। প্রাথমিক স্তরে মেয়েদের ভর্তির হার বেড়েছে, এমনকি এই হার ছেলেদের তুলনায় বেশি। মাধ্যমিক স্তরে মেয়ে শিক্ষার্থীর হারও ছেলেদের চেয়ে বেশি (৫২.৩ শতাংশ)। বৃত্তিমূলক শিক্ষায়ও এগিয়ে আসছে মেয়েরা (২৬ শতাংশ)। আগে এই হার ছিল অনুল্লেখযোগ্য। উচ্চশিক্ষা, কারিগরি এবং পেশাগত শিক্ষায়ও মেয়েদের হার আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। পাবলিক পরীক্ষায় ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা ভালো ফল করছে। কিন্তু এসব সাফল্য সত্ত্বেও মেয়েদের ঝরে পড়ার হার অনেক বেশি, বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকার মেয়েদের। শুধু শিক্ষা নয়, দীর্ঘকাল ধরে বাংলাদেশের নারীরা আরেকটি মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে। আর সেটা হলো স্বাস্থ্য। এ ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে আছে, যদিও নানা রকম উদ্যোগের ফলে জীবনের গড় আয়ু ১৯৯৪ সালের ৫৮ বছর থেকে ২০০৭ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৬৫ বছরে। এর মধ্যে নারীর সংখ্যাই বেশি। অর্থাৎ, পুরুষের তুলনায় নারীই দীর্ঘদিন বাঁচে। অন্যদিকে, প্রসূতি মৃত্যু এবং শিশু মৃত্যুর হারও উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমেছে, যদিও প্রতি লাখে এখনো (১৯৯৮-২০০০) ৩২০ জন মারা যায়। এই হার অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে ২০১৫ সালের মধ্যে এটা ১৪৩ জনে কমিয়ে আনা যে কঠিন হবে, সেই কথা বলাই বাহুল্য। নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা হচ্ছে নারী উন্নয়নের পথে আরেকটি বড় বাধা। পুরুষতন্ত্র উগ্র হয়ে উঠলেই এই সহিংসতা দেখা দেয়। কিন্তু এ সংক্রান্ত মামলা করার ব্যাপারে যেমন নিরুৎসাহিত করা হয়, তেমনি পুলিশও দুর্বল-ত্রুটিপূর্ণ-দায়সারা গোছের চার্জশিট দেয়ায় আর দীর্ঘদিন ধরে মামলা চলার কারণে নির্যাতনকারী পার পেয়ে যায়। অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে থাকা নারী ধর্ষণের শিকার হয়।
সাম্প্রতিককালে ক্ষমতায়নকে তাই নারী উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। বাংলাদেশের পশ্চাৎপদ পুরুষতান্ত্রিক মুসলিম সমাজে নারীর ক্ষমতায়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়টি দীর্ঘকাল ধরে অবহেলিত হয়ে আসছে। নারীকে তাই ক্ষমতায়নের ধারায় আনতে হলে সবার আগে প্রয়োজন রাজনৈতিক অঙ্গীকার। রাজনীতি এবং প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে নারীর যথাযথ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা জরুরি। বাংলাদেশে এ ক্ষেত্রেও ঘটেছে অগ্রগতি। নারী সাক্ষরতার হার বৃদ্ধি, প্রশাসনের নীতিনির্ধারণমূলক শীর্ষপদে অধিষ্ঠিত হওয়া, নারীর জন্য প্রায় অপ্রচলিত পেশা, যেমন পুলিশ ও সেনাবাহিনীতে নারীর নিয়োগ প্রাপ্তি।
সবচেয়ে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটেছে রাজনীতিতে। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে জাতীয় সংসদ পর্যন্ত এই অগ্রগতি লক্ষ করা যাবে। নারী সংসদ সদস্যের হার ১৯৯৫ সালের ৪.৮ শতাংশ থেকে ২০১৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮.৫৫ শতাংশে। প্রধানমন্ত্রীসহ সিদ্ধান্ত গ্রহণের সর্বোচ্চ স্তরে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়Ñ স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব পেয়েছেন কয়েকজন নারী। বর্তমান সংসদের উপনেতাও একজন নারী। কূটনৈতিক পর্যায়েও নারীরা নিয়োগ পাচ্ছে। তবে রাজনীতিতে এখনো পুরুষেরই সুস্পষ্ট প্রাধান্য। সংরক্ষিত নারী আসনে নারীরা সরাসরি নির্বাচিত হতে পারছে না। নারীর ক্ষমতায়ন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে সমানভাবে অংশগ্রহণের পূর্বশর্ত হিসেবে মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের বিষয়গুলো অপরিহার্য বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশেও স্বাধীনতার পর থেকে, বিশেষ করে গত দুই দশকে নারীর মানবাধিকারের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সরকার মানবাধিকার সুনিশ্চিত করার জন্য সাংবিধানিক ধারা (ধারা ১০, ধারা ১৯) সংযোজনের পাশাপাশি প্রণয়ন করেছে বিভিন্ন আইন ও বিধিবিধান। কিন্তু নারীরা যাতে আইনের আশ্রয় নিতে পারে, ন্যায়বিচার পায়, সেসবেরও ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য মানবাধিকার কমিশনকেও বিশেষভাবে উদ্যোগী হতে হবে। এজন্য পৃথকভাবে একটা সেল গঠন করা যেতে পারে কিংবা গঠন করা যেতে পারে নারী মানবাধিকার কমিশন। সিডোও’র প্রতিটি ধারার বাস্তবায়ন এবং পারিবারিক আইনে এর অন্তর্ভুক্তি জরুরি। উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা নারী উন্নয়নের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র চিহ্নিত করেছেন। আর সেটা হলো নারী ও গণমাধ্যম। গত দুই দশকে টিভি চ্যানেলের মহাবিস্ফোরণ, ইন্টারনেটের ব্যাপক ব্যবহার ও সহজলভ্যতা, প্রিন্ট মিডিয়া বা সংবাদপত্র ও সাময়িকী প্রকাশের ক্ষেত্রে ঘটে গেছে বিপ্লব। বাংলাদেশের নারীরা এসব গণমাধ্যমের অনুষ্ঠান পরিকল্পনা, নীতিনির্ধারণ ও উপস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, নানা রকম সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও নারী উন্নয়নের ক্ষেত্রে অনেক অগ্রগতি ঘটেছে। কিন্তু অনেক কিছু এখনো অনর্জিত থেকে গেছে। তবু আমাদের প্রত্যাশা, নারী উন্নয়নের ধারা অক্ষুণ্ন রাখার মধ্য দিয়ে একুশ শতকের বাংলাদেশ হয়ে উঠুক নারী-পুরুষের সমতা ও সমানাধিকারের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত এক স্বপ্নের বাংলাদেশ।

No comments:

Post a Comment