কান টানলে মাথা আসে
শিরোনাম দেখেই অনেকে বুঝবেন, কেন এই প্রাবাদিক কথাটা বললাম। বাংলায় এটা খুব চালু। বাস্তব আর চর্চার ধারা থেকেও এই প্রবাদ কথাটির মর্ম আমরা জানি। এটা সৃজিত হয়েছে সামাজিক মানুষের অভিজ্ঞতা থেকে। অভিজ্ঞতা যখন অভিজ্ঞানে পৌঁছে, তখন তা ইউনিভার্সাল সত্যে পরিণত হয়। সাধারণত কোনো মানবপ্রাণী তার বদ্ধমূল ধারণাকে পাল্টাতে পারে না। কারণ, ধারণাটি বদ্ধমূল হয়ে গেলে সেই ধ্যানের ধারাপাতের অরবিট থেকে মানবচিন্তা বের হতে পারে না। কান টানার জ্ঞান তাই বিশ্বমাত্রিক।
ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ক্যাবিনেটে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে রেক্স টিলারটনকে নমিনেশন দিয়েছেন। তিনি রাশিয়ায় তেলের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত এবং ব্যক্তিগতভাবে ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গেও রয়েছে তার সখ্য। আবার ট্রাম্প সিআইএর প্রধান হিসেবে নমিনেশন দিয়েছেন বুশ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের সময় সিআইএর ‘টর্চার অ্যান্ড কিডন্যাপিং উইথইন দ্য ল অ্যান্ড উইথইন দ্য কনস্টিটিউশন’ প্রোগ্রামের হোতা মাইক পমপেওকে।
এই ‘কিডন্যাপ ও টর্চার’কে নিয়ে আসতে চাইছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেজন্যই পমপেওকে তিনি মনোনীত করেছেন সিআইএপ্রধান হিসেবে। আগামী সপ্তাহেই ট্রাম্পের অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের টপমোস্ট মন্ত্রীদের মনোনয়ন অনুমোদন দেবে সিনেট। তবে সিনেট কমিটি তাদেরকে ঝাড়াই-বাছাই করে নেবে। সিনেট অনুমোদন দিলেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাওয়া বাস্তব হবে। হাউসের সংখ্যাগরিষ্ঠ রিপাবলিক দলের প্রধান ম্যাককনেল বলেছেন, সবাই পেয়ে যাবেন অনুমোদন। এটা তার রাজনৈতিক বিশ্বাস। রাজনৈতিক বিশ্বাসীরা ধর্মবিশ্বাসীদের মতো নয়। তারা কাজ করেন নিজেদের ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থে। দেশ এবং জনগণ সেখানে বর্মমাত্র। দেশ এবং জনগণের নামে তারা তাদের রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল করবেন।
কান টানলে যে মাথা আসে, এবার তা নিশ্চয়ই বোঝা গেছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনে জিতেছেন সংখ্যালঘু হিসেবে। তিনি পপুলার ভোটে হেরে ইলেক্টোরাল ভোটে বিজয়ী হয়েছেন। তাও আবার সেই বিজয়ও বিতর্কিত, রাশিয়ার হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে নাকি জিতেছেন। সিআইএ এটা জানিয়েছিল আগেই। গত সপ্তাহে সিআইএর সঙ্গে এফবিআই এবং ন্যাশনাল সিকিউরিটিও যোগ দিয়ে বলেছে, রাশিয়ার হ্যাকিংয়ের মাধ্যমেই জিতেছেন ট্রাম্প। তিনি নিজে আগে এই হ্যাকিংয়ের বিষয়টি উড়িয়ে দিলেও গত সপ্তাহে সিআইএ, এফবিআই এবং অন্যান্য সিকিউরিটির সঙ্গে ব্রিফিংয়ের সময় স্বীকার করেছেন, রাশিয়া সিনেট এবং ডেমোক্র্যাটদের প্রচারণা সেলসহ সব বিষয় এবং ভোটিং সিস্টেমের ওপর চড়াও হয়েছিল। এটা তাদের অব্যাহত কাজের ধর্ম। চীনারাও নাকি আমেরিকার ওপর সাইবার আক্রমণ চালাচ্ছে প্রতিনিয়তই। সেই আলোচনার টেবিলে ট্রাম্প স্বীকার করেছেন তার পক্ষে রাশিয়ার সাইবার সহযোগিতার কথা। এখানকার ছোট-বড় সব পত্রিকায়ই এ সংক্রান্ত রিপোর্ট হয়েছে। তার মানে, ‘প্রেসিডেন্ট-ইলেক্ট’ ডোনাল্ড ট্রাম্প কোনো বৈধ নির্বাচিত রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট নন। কিন্তু এখনো এই অবৈধভাবে নির্বাচিত বা হ্যাকিং-কারচুপির মাধ্যমে নির্বাচিত একজন আমেরিকার প্রেসিডেন্সির দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন। অথচ হাউস ও সিনেট কোনো টু শব্দ করছে না। কারণ কি এটাই যে, তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ রিপাবলিকান বলে? এতে যে দেশ ও জাতির ক্ষতি হবে, সেটা কি ওই অভিজ্ঞ রাজনীতিকরা বুঝতে পারছেন না? আমার ধারণা, তারা বুঝেছেন। কিন্তু দলীয় স্বার্থে তারা রা করছেন না। দলের জন্য অন্ধ হলে যে দেশের এবং আমজনতার ক্ষতি হতে পারে, অতীতেও এমনটা ঘটেছে, সেটা তারা বিবেচনায় নিচ্ছেন না। একেই বলে দলান্ধ রাজনীতিক। দলান্ধ হলে বা সংবিধানের ত্রুটি-বিচ্যুতি সংশোধনের ব্যাপারে যারা নিশ্চুপ থাকে, তারা দেশ ও জনগণের সার্বিক মুক্তির প্রশ্নটি উপেক্ষা করেন। আমেরিকান নির্বাচনের ইলেক্টোরাল সিস্টেম যে একটি অবৈধ ও গণতন্ত্রবিরোধী ব্যবস্থা, সেটা বোঝার মতো মেধা তাদের থাকলেও তা রেইজ করার কোনো ভয়েস নেই বললেই চলে। আমার এই ধারণা যে, সিনেট ও হাউসের প্রধান কাজই হচ্ছে আমেরিকান নির্বাচন পদ্ধতি থেকে অগণতান্ত্রিক ইলেক্টোরাল সিস্টেম উপড়ে ফেলার বিল তৈরি এবং তা পাস করিয়ে আনা। দেশের ভোটার জনগণ যাকে বেশি ভোট দেবে, তিনিই হবেন দেশের প্রেসিডেন্ট। সেই সঙ্গে নির্বাচনের সময় মন্ত্রীপদের মনোনয়নও জরুরি। তাদেরও জনগণের ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়ে আসতে হবে। কারণ, তারা নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের অনির্বাচিত বা টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী হয়ে ক্ষমতায় বসছেন। এটাও অগণতান্ত্রিক। সিনেট ও হাউসের সদস্যরা নির্বাচিত হয়ে আসছেন। তাহলে মন্ত্রীরা কেন নির্বাচিত হবেন না। তারা প্রেসিডেন্টের মনোনয়নের মাধ্যমে সিনেটের নির্বাচনের পর ক্ষমতায় যাচ্ছেন, যা আইয়ুবশাহীর মৌলিক গণতন্ত্রের মতোই ব্যবস্থা। এই পরোক্ষ ব্যবস্থাটা গণতন্ত্রে খাপ খায় না। বর্ণবাদিতা যদি উপড়ে ফেলতে হয়, তাহলে গ্রাসরুটের অধিকার সুনিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। ধনিক শ্রেণির স্বার্থ বা ব্যবসা-বাণিজ্যওয়ালাদের স্বার্থ উদ্ধারের নীতি, যা পুঁজিবাদী কর্পোরেট-গণতন্ত্রের নীতি হিসেবে পরিগণিত, তা পরিহার করতে হবে। আশার কথা এই যে, আমেরিকার ১১ স্টেট (ডিস্ট্রিক্ট অব কলাম্বিয়াসহ) এর মধ্যেই পপুলার ভোটের পক্ষে আইন পাস করেছে। বাকি স্টেটগুলোও এই পথ ধরে এগোতে পারে। তবে আমার বিবেচনা, সংবিধান সংশোধন করে ইলেক্টোরাল কলেজ পদ্ধতির শিকড় উপড়ে ফেলাই আসল কাজ।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, ইউএসএ, একটি এনজিও, বেশ কয়েক বছর ধরেই আমাকে তাদের বিভিন্ন প্রোগ্রামের বিষয়-আশয় জানান। একজন অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবে এই সংস্থা বিশ্বের বিভিন্ন ব্যক্তির রাজনৈতিক, সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার পক্ষে জোর প্রচারণা চালাচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যে হারে ‘হিউম্যান রাইটস’ ক্ষুণœ হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে এই সংস্থাটি বিভিন্ন সামাজিক ফোরামের মাধ্যমে সচেতনতা গড়ে তুলে তার অবসান চাইছে। কিন্তু মানবপ্রাণীসমাজ তো সেই আদিম চেতনার লিগ্যাসি পরিত্যাগ করতে পারেনি হাজার হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ও মানবিক চেতনার চর্চা ও বিকাশের পরও। তাই দেখা যায়, ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্ত্রিপরিষদে আবারো জায়গা করে নিতে যাচ্ছে কট্টরপন্থী কিডন্যাপিং ও টর্চার চেতনার মানুষ মাইক পমপেও। তেল ব্যবসায়ী, যিনি রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত, রেক্স টিলারটনকে কী উদ্দেশ্যে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে, তা বোধগম্য নয়। এই বোধ আমাদের হবে, যদি আমেরিকা নানাভাবে পর্যুদস্ত হতে থাকে পররাষ্ট্রনীতিতে এবং রাশিয়ার হাতে কৌশলগতভাবে হারতে থাকে। তখন আর সময় থাকবে না আমেরিকার সেসব ভুলের লাগাম টেনে ধরার। একটা ভুলের খেসারত যে কতভাবে টানতে হয়, বুশের তছনছ করে যাওয়া প্রেসিডেন্সিতে তার স্বাক্ষর রয়ে গেছে। ৮ বছরের টানা শাসনের পরও ডেমোক্র্যাটিক প্রেসিডেন্ট বারাক হোসেন ওবামা দেশের অর্থনীতির কোমর পুরোপুরি সোজা করতে পারেননি। তার কারণ, পদে পদে বিরোধী রাজনৈতিক দল রিপাবলিকানদের বাধা। বিশেষ করে ‘ওবামাকেয়ার’ ও ‘ইমিগ্রেশন সিস্টেম রিফর্ম’ প্রশ্নে রিপাবলিকানরা দেশ এবং জনগণের আকাক্সক্ষার বিরোধী ছিলেন। ঘোর ইমিগ্রেশনবিরোধী-মুসলিমবিরোধী ট্রাম্প ওবামাকেয়ার, যা জনগণের স্বাস্থ্যবীমার আইনি ব্যবস্থা, তা বাতিল করে দেবে; এবং মুসলমানরা আর যাতে এ দেশে ইমিগ্র্যান্ট হতে না পারে, সেই ব্যবস্থাই নিতে যাচ্ছে। এ কারণেই বেছে বেছে কট্টর ও বর্ণবাদীদের তিনি নমিনেশন দিয়েছেন। আগামী দিনগুলোতে কী হবে এ দেশের সাধারণ মানুষের ভাগ্যে, তা কেউ বলতে পারে না।
লেখক: ড. মাহবুব হাসান; কবি, সাংবাদিক, আমেরিকা প্রবাসী
No comments:
Post a Comment