Wednesday, January 11, 2017

ইয়াবার ভয়ঙ্কর আগ্রাসন

মহামারী রূপ নিয়েছে ক্রেজি ড্রাগ ইয়াবা। শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে গ্রামের আনাচেকানাচে পর্যন্ত বিস্তার ঘটেছে নীরব এই ঘাতক ইয়াবা ট্যাবলেটের। ইয়াবায় সম্পৃক্ততা মিলছে জঙ্গিদেরও। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী, তরুণ-তরুণী, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবীদের অনেকেই এখন ইয়াবায় আসক্ত। তবে এদের মধ্যে ছাত্র-ছাত্রী তরুণ-তরুণীর সংখ্যাই বেশি। ইয়াবার ভয়াবহ ধোঁয়া আগামী প্রজন্মকে আজ ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। এ অবস্থায় আগামীতে দেশ মেধাশূন্য হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ইয়াবার ভয়াবহ আগ্রাসন নিয়ে সরকার যেমন উদ্বিগ্ন, চিন্তিত অভিভাবকমহলও। দেশের সর্বত্র মহামারীরূপে ছড়িয়ে পড়ছে সর্বনাশা মাদক ইয়াবা। ইয়াবাসেবীর সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। প্রতিদিন দেশের একপ্রান্ত টেকনাফ থেকে বিভিন্ন উপায় ও কৌশলে ইয়াবা ছড়িয়ে পড়ছে দেশের আরেক প্রান্ত তেঁতুলিয়া পর্যন্ত। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে, গ্রামগঞ্জে এখন ইয়াবার জমজমাট ব্যবসা প্রসারিত। মিয়ানমারের ৬০ টাকার এই ট্যাবলেট পাচার হয়ে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিক্রি হচ্ছে ৪শ’ থেকে ৫শ’ টাকায়। এটি ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। আর এ কারণে পেশা পরিবর্তন করে মাদক ব্যবসায় ঝুঁকছে অনেক মানুষ।
সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ, এমপি, রাজনৈতিক নেতা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কতিপয় সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত শক্তিশালী সিন্ডিকেট ইয়াবা ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে। এ কারণেই কোনোভাবেই এর আগ্রাসন রোধ করা যাচ্ছে না, ঠেকানো যাচ্ছে না ইয়াবার ব্যবসা। মাদক চিকিৎসার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা বলেছেন, এখন চিকিৎসা নিতে আসা মাদকসেবীদের অধিকাংশই ইয়াবা আসক্ত। মাদকসেবীরা ধোঁয়ায় উড়িয়ে দিচ্ছে বিপুল অংকের টাকা। ইয়াবার সর্বনাশা থাবায় লাখো পরিবারের সন্তানদের জীবন এখন বিপন্ন। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধ্বংস করে মাদক ব্যবসার এই সিন্ডিকেট হাতিয়ে নিচ্ছে হাজার কোটি টাকা।
ইয়াবা প্রবেশ রোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতীতের চেয়ে এখন বেশি তৎপর। ২০১৪ সাল পর্যন্ত বিগত সাত বছরে ৯৫ লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হলেও গত বছরে উদ্ধার হয়েছে দুই কোটি পিসেরও বেশি। ইয়াবার ভয়ঙ্কর থাবায় চূড়ান্ত সর্বনাশের অতল খাদের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে এদেশে একশ্রেণির মাদকাসক্ত তরুণ সম্প্রদায়। গাঁজা, ফেনসিডিল, হেরোইনকে ছাপিয়ে ইয়াবা হয়ে উঠেছে শীর্ষ নেশার বস্তু। বিশেষ বিশেষ সামাজিক স্তরের তরুণ-তরুণীদেরও একমাত্র নেশা হয়ে উঠেছে ইয়াবা ট্যাবলেট। মিয়ানমার থেকে সীমান্ত পথে আসা ইয়াবা এদেশীয় একদল মাদক ব্যবসায়ী-গডফাদারদের ছত্রচ্ছায়ায় বিতরিত হয়ে বলে এই মারাত্মক মাদক দ্রব্যটি এদেশে ছড়িয়ে পড়েছে অতি দ্রুততার সঙ্গে। ২৫ থেকে ৩৫ মিলিগ্রাম মেথ্যাম ফিটামিনের সঙ্গে ৪৫ থেকে ৬৫ মিলিগ্রাম ক্যাফিন মিশিয়ে তৈরি ইয়াবা একটি ভয়ঙ্কর মাদকদ্রব্য—যা যুবসমাজকে গ্রাস করে নিয়েছে একালে। এর প্রতিটি ট্যাবলেটের দাম মান ভেদে ১৫০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত। এই নিয়ে নানা সামাজিক সমস্যায় জড়িয়ে পড়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে মাদকাসক্তদের পরিবারগুলো। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের সূত্র মতে, ইয়াবাবিরোধী বিভিন্ন অভিযানে ২০১৪ সালে যেখানে আটক হয়েছে ৬৫ লাখেরও কিছু বেশি ইয়াবা, একই সময়ে এদেশে বেচাকেনা হয়েছে ২৬ কোটিরও বেশি। এই চিত্রটি সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের পাশাপাশি সামাজিক প্রতিরোধের কথাও আমাদের ভাবতে হবে। একসময় চীন ও থাইল্যান্ড ছিল ইয়াবার বড় বাজার। ২০০০ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত ব্যাপক অভিযান চালিয়ে ইয়াবা প্রচার-প্রসারের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয় সেখানে। এমনকি বহু ইয়াবা ব্যবসায়ী ও গডফাদারদের হত্যাও করা হয়। ফলে সেসব দেশ এখন ইয়াবার থাবা থেকে মুক্ত।
হালে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত দেশের সর্বত্র মহামারী রূপে ছড়িয়ে পড়েছে নীরব এই ঘাতক। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের এক কর্মকর্তা বলেন, দেশে এই মাদকের চাহিদা বেড়েই চলেছে। বর্তমানে দিনে চাহিদা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫০ লাখ পিসে। এই বিপুল সংখ্যক ইয়াবা প্রতিদিনই বিভিন্ন কৌশলে দেশে ঢুকছে। সেবনকারীরা প্রতি পিস ইয়াবা ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায় কিনছেন। সেই হিসাবে প্রতিদিন এই মাদকের পেছনে তারা খরচ করছে পৌনে দুইশ’ কোটি টাকা। জানা যায়, মিয়ানমার থেকে ইয়াবা পাচার ঠেকাতে ২০১৪ সালে ১২ শতাধিক ইয়াবা ব্যবসায়ীর একটি তালিকা করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর। এর মধ্যে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী শীর্ষ ৪০ জনের একটি তালিকা ধরে অভিযান চালায়। কিন্তু বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির কারণে শেষ পর্যন্ত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান ভেস্তে যায়।
পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ অনুসারে দেখা যাচ্ছে, সীমান্ত এলাকার জনপদে জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের অসাধু কর্মকর্তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় রয়েছে ইয়াবা ব্যবসার বিস্তার ঘটানোর পেছনে। এই অভিযোগের সত্যাসত্য বিচার বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া আবশ্যক। দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে যে কোনো বিষফোঁড়া নির্মূলে দেশবাসীর সমর্থন থাকবে। একসময় গলি-ঘুপচি কিংবা বস্তি এলাকায় গাঁজা, ফেনসিডিল ও হেরোইনের আড্ডা ও কেনাবেচা চলত। এখন ইয়াবার রাজত্ব বস্তি ছেড়ে অভিজাত পাড়ার স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, সাইবার ক্যাফে, ফার্স্টফুড শপ, সেলুন, কফি হাউস পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। হাত বাড়িয়ে চাইলেই মিলে যাচ্ছে ইয়াবা ট্যাবলেট। পাশের বন্ধুই হয়ে পড়েছে ইয়াবা বিক্রেতা। জানা যাচ্ছে, চট্টগ্রামসহ দেশের অভিজাত এলাকাগুলোতে স্টাডি সার্কেলের মতো গড়ে উঠছে ইয়াবা সার্কেলও।
দুর্ভাগ্যজনক সংবাদগুলোর তথ্য মতে, এদের অনেকেরই বয়স ১৩ থেকে ১৯-এর মধ্যে। কেউ পড়ে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের উচ্চ শ্রেণিতে আবার কেউবা এইচএসসির ছাত্র। তাদের কাছে এটা জাস্ট এনজয় মাত্র। সেই সঙ্গে আরও একটি ভয়াবহ সংবাদ হলো—‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’-এর এক জরিপের তথ্যে বলা হচ্ছে, দেশে স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের ৭৭ শতাংশই পর্নগ্রাফি দেখায় অভ্যস্ত। এই বিকৃত রুচির সঙ্গে ইয়াবার সম্মিলন যে ঘটছে না তা কে বলবে? এই উত্তর খুঁজতে হবে সমাজকে। সমাজের অভিভাবকত্বের জাগরণ ঘটাতে হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দাখিল করা ৭৬৪ ইয়াবা ব্যবসায়ীর পৃথক আরেকটি গোপন তালিকার শুরুতেও ওইসব প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম উঠে আসে। কিন্তু তারা সবসময় থাকছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। ২০১৪ সালের মার্চে টেকনাফে ইয়াবা গডফাদার নিধনে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ অভিযান শুরু হওয়ার পর ইয়াবা চোরাচালান অনেকটা কমে যায়। ইয়াবা গডফাদাররা দেশে-বিদেশে পালিয়ে থাকে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে কয়েকজন মারাও যায়। কিন্তু গত বছর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান ঢিলেঢালা হওয়ায় গডফাদাররা আবার এলাকায় ফিরে আসে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দিয়ে প্রায়ই কাভার্ড ভ্যানে, প্রাইভেট কারে, কুরিয়ার সার্ভিসের গাড়িতে, জুতার মধ্যে, শরীরের বিভিন্ন অংশে বেঁধে ইয়াবা দেশের বিভিন্ন স্থানে পাচার করা হচ্ছে। নতুন পদ্ধতি হিসেবে কলার মধ্যে পলিথিন দিয়ে ঢুকিয়ে সেই কলা গিলে খেয়ে পেটের মধ্যে করেও পাচার হচ্ছে ইয়াবা। এই পদ্ধতি সাধারণত মহিলা ব্যবসায়ীরাই করে থাকেন। গত ১৬ জানুয়ারি ঢাকা ও চট্টগ্রামে বিশেষ অভিযান চালিয়ে ২৮ লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধার করে র‌্যাব। এ যাবৎকালের ইয়াবার সবচেয়ে বড় চালান ছিল সেটি, যার বাজার মূল্য ১১৩ কোটি টাকা। দেশে মাদকসেবীর সংখ্যা ৫০ লাখ। এর মধ্যে প্রায় ৫০ ভাগ অর্থাৎ ২৫ লাখ মানুষ ইয়াবা আসক্ত। একজন মাদকসেবী দিনে যদি সর্বনিম্নে দুটি করে সেবন করে তাহলে ২৫ লাখ মাদকাসক্ত প্রতিদিন সাবাড় করছে ৫০ লাখ পিস ইয়াবা। আর এই ৫০ লাখ পিস ইয়াবার পেছনে তারা খরচ করছে দুইশ’ কোটি টাকা।
মরণ নেশা ইয়াবার একদিনের চাহিদার এমন আশঙ্কাজনক তথ্য খোদ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, সর্বনিম্ন ব্যবহারে হিসেবে এই বিপুল পরিমাণ ইয়াবার চাহিদা-তথ্য পাওয়া গেলেও প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি। হু হু করে ইয়াবাসেবীদের সংখ্যা বেড়েই চলছে। আর এই ইয়াবা প্রতিদিন আসছে অবৈধ পথে পার্শ্ববর্তী মিয়ানমার থেকে। দেশের একপ্রান্ত টেকনাফের স্থল ও সাগর পথের ১১টি পয়েন্ট দিয়ে দিনেরাতে ঢুকছে ইয়াবা চালান আর এই ইয়াবা বিভিন্ন উপায়ে ছড়িয়ে পড়ছে দেশের আরেক মাথা পর্যন্ত। দীর্ঘদিন টেকনাফে চাকরি করছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এমন একজন কর্মকর্তা জানান, টেকনাফ সীমান্তবর্তী এলাকার মাদক প্রচারের পয়েন্টগুলোতে সর্বোচ্চ নজরদারি রাখা হলেও নানা কৌশলে অবিশ্বাস্যভাবে ইয়াবা চালান আসছে মাছ ধরা ট্রলারে জালে বেঁধে সাগরে ভাসতে ভাসতে, মহাসড়কে কাভার্ড ভ্যানে, প্রাইভেট কারে, কুরিয়ার সার্ভিসের পরিবহনের গাড়িতে, মানুষের পায়ের জুতার মোজার ভেতরে ও শরীরের বিভিন্ন অংশের মাধ্যমে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের এক কর্মকর্তা বলেন, সড়কপথে বিভিন্ন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কড়াকড়ি বৃদ্ধি পাওয়ায় পাচারকারীরা নৌপথকে নিরাপদ রুট হিসেবে বেছে নিয়েছে। নৌপথে বিভিন্ন মাছ ধরার ট্রলারে করে মাঝি-মাল্লাদের সহায়তায় এসব ইয়াবা পাচার হচ্ছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। বেশি টাকার লোভে অনেক মাঝি-মাল্লা মাছ ধরা ছেড়ে ইয়াবার হাতবদলে সহায়তা করছে বলেও তিনি জানান। এই মাঝিরা এখন তাদের আসল পেশা ছেড়ে মাদক ব্যবসায় নেমেছে। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে মিয়ানমারের ১৫টি স্থানে ৩৭টি ইয়াবা কারখানা রয়েছে। যেখান থেকে সাগর ও সড়কপথে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ, নয়াপাড়া, সাবরাং মৌলভীপাড়া, নাজিরপাড়া, জালিয়াপাড়া, নাইট্যংপাড়া, জলিলেরদিয়া, লেদা, আলীখালী, হ্রীলাসহ অন্তত ১১টি পয়েন্ট দিয়ে ইয়াবার চালান বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। এসব ইয়াবা তৈরি ও পাচারে আন্তর্জাতিক মাদক ব্যবসায়ী যেমন জড়িত রয়েছে তেমনি বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের গডফাদাররাও রয়েছে।
লেখক: রায়হান আহমেদ তপাদার ;কলামিস্ট, যুক্তরাজ্য প্রবাসী

No comments:

Post a Comment