টেকসই উন্নয়নে সবুজ শিল্পায়ন
জাতীয় অর্থনীতিতে শিল্পের অবদান প্রায় শতকরা ৩২ এবং মোট শ্রমশক্তির শতকরা ২০ ভাগ। দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ও রফতানি আয় বৃদ্ধিতে শিল্প খাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশকে ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত করতে হলে শিল্পোন্নয়নের ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। কিন্তু সেই শিল্পকে হতে হবে পরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব। শিল্পের জন্য কোনো কৃষিজমি বিনষ্ট করা যাবে না। বনভূমি ধ্বংস করা যাবে না। জীববৈচিত্র্য নষ্ট করা যাবে না। মাটি, পানি, বায়ু ও শব্দদূষণের মাধ্যমে উদ্ভিদ ও প্রাণিকুলের জীবনকে বিপন্ন করে তোলা যাবে না। শিল্পে ব্যবহৃত জ্বালানি হবে নাবয়নযোগ্য আর উৎপাদিত পণ্যও হবে পরিবেশবান্ধব। যেহেতু বাংলাদেশ একটি জনবহুল কৃষিপ্রধান দেশ, তাই এদেশের শিল্প-কারখানা হওয়া উচিত শ্রমঘন ও কৃষিভিত্তিক।
শিল্পায়ন সরকারের অগ্রাধিকার হলেও বর্তমান সরকার পরিবেশের ক্ষতি করে কোনো ধরনের শিল্পায়নের পক্ষে নয়। এজন্য সবুজ শিল্পায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে জাতীয় শিল্পনীতি-২০১৫ প্রণয়ন করা হয়েছে। পরিবেশ সুরক্ষায় ইতোমধ্যে সবুজ প্রযুক্তি ব্যবহারকারী শিল্পোদ্যোক্তাদের কর রেয়াতসহ বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। নতুন শিল্পনীতিতে পরিবেশবান্ধব শিল্প উদ্যোগের প্রতি সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রণোদনা বৃদ্ধির সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে।
বাংলাদেশের বেশিরভাগ শিল্প-কারখানায় ইটিপি ব্যবহার করা হয় না। শিল্প কারখানার তরল বর্জ্য নদী-নালা, খাল-বিলে নিক্ষেপ করা হয়। শিল্পবর্জ্য দ্বারা আমাদের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, জনস্বাস্থ্য মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর পানি পোস্তগোলা ও ফতুল্লার ৫৩টি কারখানা এবং হাজারীবাগের ১৫১টি চামড়া শিল্প দ্বারা দূষিত হচ্ছে। চামড়া শিল্পের বর্জ্যে সালফিউরিক অ্যাসিড, ক্রোমিয়াম, অ্যামোনিয়াস সালফেট, ক্লোরাইড ও ক্যালসিয়াম অক্সাইড থাকে। এগুলো চুয়ানো প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভূগর্ভের পানিতে মিশে মাটির ওপরের ও নিচের উভয় পানির উৎসকে দূষিত করে। ট্যানারির দুর্গন্ধ আশপাশের মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। অন্তত ২৯টি শিল্প-কারখানা টঙ্গী অঞ্চলের তুরাগ নদ এবং ৪২টি বৃহৎ শিল্প শীতলক্ষ্যা নদীতে বর্জ্য নিক্ষেপ করে।
খুলনার শিল্পনগরের বেশ কয়েকটি শিল্প ও দিয়াশলাই কারখানা রূপসা নদীতে বর্জ্য নিক্ষেপ করে দূষণ ঘটাচ্ছে। খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিল, হার্ডবোর্ড মিল, গোয়ালপাড়া তাপ ও বিদ্যুৎ কেন্দ্র, খালিশপুরের পাট ও লোহা শিল্প-কারখানাগুলো তাদের উৎপাদিত যাবতীয় বর্জ্য ভৈরব নদে ফেলছে। খুলনার নিউজপ্রিন্ট মিল ঘণ্টায় প্রায় ৪৫০০ ঘনমিটার বর্জ্য মিশ্রিত পানি ভৈরব নদে ফেলে।
চট্টগ্রামের কালুর ঘাট, নাসিরাবাদ, পতেঙ্গা, কাপ্তাই, ভাটিয়ারি, বাড়বকুণ্ড, ফৌজদারহাট, ষোলশহরে প্রায় ১৪০টিরও বেশি শিল্পকারখানার বর্জ্য কর্ণফুলী নদী ও বঙ্গোপসাগরে নিক্ষিপ্ত হয়। চট্টগ্রামে ১৯টি চামড়া শিল্প, ২৬টি বস্ত্র শিল্প একটি তেল শোধনাগার, একটি টিএসপি সার-কারখানা, দুটি রাসায়নিক কারখানা, পাঁচটি মাছ প্রক্রিয়াকরণ করাখানা, দুটি সিমেন্ট কারখানা, একটি পেপার রেয়নমিল, একটি ইস্পাত মিল, দুটি সাবান কারখানা, দুটি কীটনাশক কারখানা, চারটি রঙের কারখানা ও প্রায় ৭৫টি অন্যান্য কারখানা একইভাবে পরিবেশ দূষণ করে নগরবাসীর জীবন-জীবিকাকে বিপন্ন করে তুলছে।
প্রাচ্যের ডান্ডি হিসেবে খ্যাত নারায়ণগঞ্জে দেশের ৯৫ ভাগ নিট ও বস্ত্র কারখানা অবস্থিত। ইটিপি না থাকায় এসব কারখানার বর্জ্যে শীতলক্ষ্যা ও মেঘনা নদীর পানি ভয়াবহ আকারে দূষিত হচ্ছে। এছাড়া গাজীপুর, আশুলিয়া, সাভার এবং ঢাকার তৈরি পোশাকের বর্জ্য পড়ছে তুরাগ, বুড়িগঙ্গা এবং বংশী নদীতে। শিল্প কারখানার তরল বর্জ্যরে কারণে কীভাবে দূষিত হচ্ছে খাল-বিলের পানি, নষ্ট হচ্ছে মানুষের স্বাস্থ্য ও সহায়সম্পদ, তা ঢাকা রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের পেছনের কয়েকটি গ্রামের অবস্থা থেকেই বোঝা যায়। ঢাকা রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের পেছনে কাইচবাড়ি, নলাম, ডগরতলী ও নতুনপাড়া নামে চারটি গ্রাম রয়েছে। এসব গ্রামের লোকসংখ্যা প্রায় ২০ হাজার। ইপিজেডের পেছনে রয়েছে একটি খাল। খালটি গিয়ে মিশেছে কন্ডাবিলে। খাল থেকে কন্ডাবিল প্রায় ৮০০ গজ দূরে। কন্ডাবিলের পানি মিশেছে বংশী নদীতে। খাল ও কন্ডাবিল মিলে এই চার গ্রাম। এসব গ্রামের ঘরের চাল, বেড়ার টিন, বিল্ডিংয়ের রড়ের অংশ, মোবাইল ফোনের চার্জারের পিন, বাইসাইকেল সব কিছুইতেই ধরছে মরিচা। বছর না ঘুরতেই ঝাঁঝরা হয়ে যাচ্ছে ঘরের টিন। খোসপাঁচড়ায় আক্রান্ত হচ্ছে শত শত মানুষ। সেখানকার মানুষের ধারণা, গ্রামের পাশের খাল দিয়ে বয়ে যাওয়া তরল শিল্পবর্জ্যরে প্রভাবেই তাদের এই দুঃসহ অবস্থা। খালের পানি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে পরীক্ষা করে দেখা গেছে, শিল্পবর্জ্যরে কারণে খালের পানির দূষণ ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। পানিতে মিশে থাকা সালফায়েড বাষ্পীয় রূপ নিয়ে টিন বা লোহা জাতীয় সামগ্রীতে মরচে ধরাচ্ছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দূষণের যে লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, তাতে এলাকার মানুষের যকৃৎ ও কিডনি আক্রান্ত হতে পারে। এছাড়া ওই সব গ্রামের ফসল এবং খাওয়ার পানিও নিরাপদ নয়।
২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের দুই তৃতীয়াংশ মানুষ নগরে বসবাস করবে। নগরবাসীর সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাড়বে শিল্পপণ্যের চাহিদা। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রয়োজনীয় পরিবেশবান্ধব শিল্পপণ্যের চাহিদা মেটাতে বিভিন্ন দেশের মধ্যে সবুজ প্রযুক্তি হস্তান্তর, পরিকল্পিত নগরায়ণ এবং শিল্পায়নের কোনো বিকল্প নেই। পরিকল্পিত নগরায়ণ ও সবুজ শিল্পায়নের ধারা জোরদারকরণের জন্য বাংলাদেশ বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ২০২০ সালের মধ্যে শিল্পসমৃদ্ধ বাংলাদেশ নির্মাণের লক্ষ্যে শিল্পদূষণ থেকে পরিবেশ ও নগর সুরক্ষায় প্যারিস জলবায়ু সম্মেলনে যে কর্ম-পরিকল্পা উপস্থাপন করা করেছে, সেই আলোকে বাংলাদেশ জ্বালানি ও বিদ্যুৎ, পরিবহন এবং শিল্প খাতে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের পরিমাণ ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার কাজ চলছে। এ লক্ষ্যে জ্বালানি সাশ্রয় ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে ইতোমধ্যে ৪০ লাখ বাড়িতে সোলার প্যানেল স্থাপন করা হয়েছে। শিল্প-কারখানার উৎপাদন বাড়াতে ক্লিনার প্রোডাকশন সিস্টেম চালুর পাশাপাশি সব শিল্পপার্কে ও ইপিজেডে গ্রিন সেল চালু করা হচ্ছে।
পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নের ব্যাপারে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মোহিতের বক্তব্য হলো সবুজ শিল্পের জন্য ব্যবসায়ীদের আরও বেশি করে কর দিতে হবে। যাতে এই অতিরিক্ত অর্থ দিয়ে সরকার পরিবেশ দূষণ রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। বর্তমান রাজস্ব আয় দিয়ে সবুজ শিল্পায়নের জন্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ অন্যান্য সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। এজন্য রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে। আমাদের জমির স্বল্পতা রয়েছে। এজন্য সরকার অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠন করছে। অর্থনৈতিক অঞ্চলে কারখানা স্থাপন করলে ইটিপিসহ সবুজ শিল্পায়নের প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। যে শিল্পনীতি অনুমোদন করা হয়েছে তাতে টেকসই উন্নয়নের জন্য সবুজ শিল্পায়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। সরকার সবুজ শিল্প-কারখানা প্রতিষ্ঠায় নানা ধরনের ইনসেনটিভ সহায়তা দেবে। সবুজ শিল্পায়নের স্বার্থে সাভারে চামড়া কারখানা স্থানান্তর বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সবুজ কারখানা প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ ব্যাংকের তহবিল হতে বার্ষিক ৯ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়া হচ্ছে। যেহেতু সবুজ কারখানা তৈরিতে ব্যয় বেশি, তাই এই ঋণের সুদের হার কমাতে হবে। পরিবেশবান্ধব সবুজ শিল্পায়নে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির ক্ষেত্রে কোনো ধরনের শুল্ক না বসানোর দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই। পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে শতকরা দুইভাগ সুদে ব্যাংকঋণের ব্যবস্থা করতে সরকারের প্রতি দাবি জানান সংগঠনটি। এ ছাড়া গ্রিন ডেভেলপমেন্ট ফান্ড গঠনের পরামর্শ দিয়ে বলা হয়, এ ফান্ডে অর্থ রাখলে কর ছাড়ের সুবিধা দিতে হবে।
টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অনুসারে ভবিষ্যতের শিল্প হবে পরিবেশবান্ধব। পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত করেই উদ্যোক্তাদের শিল্প-প্রতিষ্ঠান স্থাপনে বিনিয়োগ করতে হবে। এজন্য শুধু নীতিগত সহায়তাই নয়, সরকারকে আর্থিক সহায়তার হাতও বাড়িয়ে দিতে হবে। পরিবেশবান্ধব সবুজ শিল্পায়নের বাজেটেও বিভিন্ন ধরনের সুবিধা দেওয়া উচিত। ২০১৪-১৫ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, দেশীয় শিল্পের যেসব খাত পরিবেশ দূষণের ক্ষেত্রে অতিমাত্রায় সংবেদনশীল, সেসব শিল্প-মালিকদের ইটিপি স্থাপনে উৎসাহ এবং পরিবেশ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে পরিবেশ হানিকর শিল্প-প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত সব ধরনের পণ্যের ওপর ১ শতাংশ হারে পরিবেশ সুরক্ষা সারচার্জ আরোপের প্রস্তাব করা হয়।
অপরিকল্পিত শিল্পায়নের কারণে চীনের পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য আজ মারাত্মক বিপর্যয়ের সম্মুখীন। এ অবস্থার অবসানে ২০১৮ সাল থেকে বিভিন্ন শিল্প-কারখানায় কার্বন নিঃসরণের ওপর শুল্ক আরোপ করবে চীন। ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হবে এ নীতি। নীতি অনুযায়ী, প্রতি ইউনিটে বায়ুদূষণের জন্য ১ দশমিক ২ ইউয়ান করে শুল্ক পরিশোধ করতে হবে শিল্প-কারখানাগুলোর। একইভাবে পানিদূষণে ১ দশমিক ৪, কয়লাভিত্তিক দূষণে ৫ ইউয়ান এবং প্রতিটন বর্জ্যরে কারণে ১ হাজার ইউয়ান করে শুল্ক পরিশোধ করতে হবে। এছাড়া শব্দদূষণের কারণেও গুনতে হবে শুল্ক। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির এদেশটির সরকার বায়ুদূষণ কমানো, ফসলি জমি রক্ষা এবং পানিদূষণ রোধের ব্যাপক চেষ্টা করেও বারবারই ব্যর্থ হচ্ছে। এ কারণে করনীতিতে পরিবর্তন এনে শিল্প-কারখানার ওপর শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয়। চীনে বায়ুদূষণের কারণে প্রতিদিন ৪০০০ লোকের মৃত্যু ঘটে। পরিবেশদূষণের কারণে সম্প্রতি চীনে ১৭ হাজার শিল্প-করাখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আমাদের দেশের শিল্পদূষণ রোধে চীনের ন্যায় শুল্ক আরোপের মতো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলে অনেকে মনে করেন। অন্যথায় পরিবেশদূষণের ক্ষেত্রে চীনকে ছাড়িয়ে যেতে বাংলাদেশের বেশি সময়ের প্রয়োজন হবে না। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় গৃহীত কর্মপরিকল্পনাগুলো কোনো কাজেই আসবে না এবং ব্যর্থ হবে টেকসই শিল্প উন্নয়ন।
লেখক: নিতাই চন্দ্র রায়;অবসরপ্রাপ্ত মহাব্যবস্থাপক (কৃষি)
No comments:
Post a Comment