বরফ রাজ্যে উৎসব-পার্বণের তালাশ
উত্তর গোলার্ধের দেশ সুইডেন কাবু হয়ে পড়ে শীতে। কনকনে ঠা-া আর ঘুটঘুটে অন্ধকারে জীবন খুঁজে পায় না তার ছন্দ। একটু আলোর জন্য একটু উষ্ণতার জন্য কেউ কেউ উড়ে যায় গরমের দেশে, কেউ চলে যায় শীতনিদ্রায়। হতাশা, শূন্যতা আর একাকিত্বের দংশনে পতন ঘটে কিছু কিছু জীবনের, ছিন্ন হয় কিছু সম্পর্ক-সংসার; উন্মাদ মানুষের দেখা মেলে পথেঘাটে। আমরা যারা গরমের দেশ থেকে এসেছি, যেখানের চিরহরিৎ প্রকৃতি আমাদের তরতাজা রাখত, যেখানে সূর্যের আলো আর তাপ আমাদের জীবনে ছন্দ দিত, দিত গতি, সেই আমরা গতিহীন হয়ে পড়ি স্ক্যান্ডিনেভিয়ান শীতে। এখানে শীত এলে তাই ‘দেশে’ যাওয়ার আয়োজন চলে, নয়ত সপ্তাহ দুয়েক রোদ পোহানোর জন্য তুরস্ক, গ্রিস, স্পেন, দুবাইর টিকিট খোঁজা হয়। ভিটামিন-বি ক্যাপসুল এদেশের জাতীয় মেডিসিন। সস্তায় সূর্যের আঁচ খরিদ করা আর কি!
অন্ধকার তাড়াতে ডিসেম্বরের শুরু থেকেই ঘরে-বাইরে আলোকসজ্জার আয়োজন। সঙ্গে এসে জুড়ে ক্রিসমাসের সজ্জা। অফিস, মার্কেট, সড়ক দ্বীপ, স্টেশনগুলো আঁধারের মাঝে একটা মিনমিনে অবয়ব নিয়ে নিজেকে জানান দেয়। ঘরের খিড়কি, দুয়ার, বারান্দায় জ্বেলে দেওয়া হয় ডিজিটাল প্রদীপ। এ আলো তুষারে প্রতিফলিত হয়ে এক মায়াবী রং জেগে ওঠে চারধারে। আমরা কেউ কেউ এই মায়ার প্রেমে পড়ে যাই। এই রংটি নিজে জেগে আমাদের বলে, জাগো।
ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে সত্যি সত্যি জেগে ওঠে সুইডেন। ব্ল্যাক ফ্রাইডে, ক্রিসমাস, ক্রিসমাস সেল আর নিউ ইয়ার। উৎসবমুখর এই দিনগুলোর কাছে পরাজয় মানে অন্ধকার এবং শীত। সুইডেনের তিনটি বড় উৎসবের দুটিই আটকা পড়েছে একটি সপ্তাহর ফ্রেমে; ক্রিসমাস ইভ আর থার্টিফার্স্ট নাইট। উৎসব চলে তাই পুরো সপ্তাহ। তৃতীয় বড় উৎসব মিডসামার।
বাঙালি উৎসবপ্রিয় জাতি। বারো মাসে তেরো পার্বণের খোঁজ এই বরফের রাজ্যেও। এখানে বাঙালি তাক লাগানো উৎসব আয়োজন করে। পয়লা বৈশাখ, পয়লা ফাল্গুন, ভাষা দিবস, স্বাধীনতা, বিজয় দিবস কিংবা পিঠা উৎসব যেমন ঘটা করে পালিত হয় তেমনি পালিত হয় ঈদ, পূজো। আঠারো ঘণ্টা রোজার পর রাত ১১টায় ইফতার পার্টির আয়োজন চলে বাসায়, কমিউনিটি সেন্টারে, মসজিদে। জন্মদিন, বিয়েবার্ষিকী, কলেজ সমাপনী উৎসব, নতুন বাসায় ওঠার পার্টি। আছে পিকনিক, দলেবলে বারবি-কিউর আয়োজন। বাঙালির উৎসবের কমতি নেই। হলফ করে বলতে পারি দেশে বসেও এত পার্বণ-উৎসবের দেখা পাইনি।
শীতে কিছুটা ছেদ পড়ে এই হুল্লোড়ে। দিনগুলো বিমর্ষ, রাতগুলো হন্তারক। কোথাও কেউ নেই। যেন হরতাল আর কারফিউ শুয়ে আছে পথে। অথচ এই শব্দগুলো এদেশে অপরিচিত। তবে কি প্রকৃতি অসৎ রাজনীতি করছে আমাদের সঙ্গে? যারা ডিসেম্বরে থেকে যায় এদেশে তারা ক্রিসমাস আর নিউ ইয়ারের উৎসবের জন্য দম পুষে রাখে। ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে দম ফেলার পর্ব। শাদা চামড়াদের পাশাপাশি আমরাও উদ্বেলিত হই, হই হই করি। আরবরা করে, ল্যাটিনরা করে, আফ্রিকানরা করে, ধার্মিকরা করে, নাস্তিকরা করে। এই হই হই জীবনের জন্য। একটু আলোর জন্য, একটু উষ্ণতার জন্য। মৃত্যুময় উপত্যকায় অকস্মাৎ জীবনের ভিড়। এই ভিড়ে আমরা বাঙালিরা অবগাহন করতে পারি অনায়াসে।
এবারের বড়দিনে আমাদের গিন্নিরা স্টকহোমের স্কারপনেকে যে টেবিল সাজিয়েছিল, যে রকম সমাগম হয়েছিল ব্রুনেটদের, তা দেখে ব্লন্ডরা বলেছিল, কীভাবে পার? ক্রিসমাস তো আমাদের উৎসব, অথচ আমরা দশজনের আয়োজন করতেই হিমশিম খাই। আমি বলেছিলাম, আমরা পারি। আমরা বাঙালি। কিংবা নিউ ইয়ারে আমাদের বন্ধু তার স্কুগোসের বাড়িতে বাঙালিদের যে সমাগম ঘটিয়েছিল, বন্ধুপতœীর রন্ধনশৈলী, মুখরোচক নানা পদ, আড্ডা আর রাতভর আকাশে রকেটবাজি করে যে ছন্দ আমরা ফিরিয়ে এনেছিলাম জীবনে, সে ছন্দ যেন এক টুকরো বাংলাদেশ, উত্তর গোলার্ধের বরফ সরিয়ে লাল সবুজের এক চিমটি মাটি উঁকি দিল যেন সহসা।
এখানে আমরা এমনই করি। বাটি চালান দিয়ে পর্ব খুঁজি। ছোটখাটো ঘটনা বা অজুহাতে বড় আয়োজনে মাতি। আমরা একত্রিত হই। আমরা সম্পর্কের উষ্ণতায়, সান্ন্যিধ্যের আলোয় শীত তাড়াই, অন্ধকারকে দূরে ঠেলে দিই। রবীন্দ্রনাথ যেমনটা শিখিয়েছেন, চোখের আলোয় আমরা চোখের বাইরেটা দেখি। অন্ধকার ঘনিয়ে এলে আমরা অন্তর দিয়ে দেখি।
আমাদের তো দেখতে হবে ভাই!
লেখক: শাকিল রিয়াজ; কবি, সাংবাদিক, কলামিস্ট; তিনি সুইডেন প্রবাসী।
No comments:
Post a Comment