Monday, February 19, 2018

ডিমের সাদা অংশ উচ্চ রক্তচাপ কমায় 

সকালের নাস্তায় অনেকে ডিম ছাড়া ভাবতেই পারেন না। এটি স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী। ডিম ওমলেট, রান্না, সিদ্ধ, পোচ- সবভাবেই খাওয়া যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, পুরো ডিম খাওয়ার চেয়ে শুধু ডিমের সাদা অংশে ক্যালরি ও চর্বি কম থাকে। এই সাদা অংশ উচ্চ রক্তচাপ কমায়।
ডিম থেকে কুসুম সরানো হলে তাতে কোনো কোলেস্টেরল থাকে না। যাদের রক্তে কোলেস্টেরলের পরিমাণ বেশি তারা নির্দ্বিধায় ডিমের সাদা অংশ খেতে পারেন। এতে হৃদরোগ কিংবা কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়ার ঝুঁকি কম থাকে।
গোটা ডিম প্রোটিনে ভরপুর থাকে। কিন্তু ডিমের সাদা অংশে খুব কম পরিমাণে প্রোটিন থাকে, যা শরীরের জন্য খুব উপকারী। তবে উচ্চ প্রোটিনসম্পন্ন খাবার আমাদের মাংসপেশি গঠনে সহায়তা করে। এমনিতেও ডিমে খুব বেশি ক্যালরি থাকে না। আর কুসুম না থাকলে তাতে ক্যালরির পরিমাণ আরো কমে যায়। তাই ওজন কমাতে চাইলে গোটা ডিমের বদলে ডিমের সাদা অংশ খেতে পারেন।
ডিমে থাকা পটাশিয়াম রক্তে পটাশিয়ামের মাত্রা কমায় এবং উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে। আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, ডিমের সাদা অংশে পেপটাইড নামে একটি উপাদান তাকে যা, উচ্চ রত্তচাপের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। এছাড়া এটি হৃদরোগের ঝুঁকিও কমায়।
ডিমের সাদা অংশে প্রয়োজনীয় ভিটামিন এ, বি-১২ এবং ডি থাকে। এছাড়া এতে থাকা ভিটামিন বি-২ বার্ধক্যজনিত নানা ধরনের ক্ষয়রোধ, চোখের ছানি পড়া এবং মাইগ্রেনজনিত মাথা ব্যথা রোধ করে।

Monday, January 22, 2018

বিশ্বের ৮২ শতাংশ সম্পদ এক শতাংশ 

ধনীর হাতে

গত বছর বিশ্বে যে পরিমাণ সম্পদ তৈরি হয়েছে তার কোনো ভাগই পায়নি বিশ্বের প্রায় অর্ধেক মানুষ। তবে ওই সম্পদের প্রায় ৮২ শতাংশই গেছে বিশ্বের মাত্র এক শতাংশ ধনীর হাতে। ব্রিটিশ দাতব্য সংস্থা অক্সফাম ইন্টারন্যাশনাল বার্ষিক বৈষম্য শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরেছে।
ওই প্রতিবেদনে অক্সফাম ইন্টারন্যাশনাল বলছে, ‘২০১৭ সালে বিশ্বে কোটিপতিদের সম্পদ বেড়েছে প্রায় ৭৬২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বৈশ্বিক চরম দারিদ্র্য দূর করার জন্য এ অর্থ যথেষ্ঠ।’
অক্সফাম ইন্টারন্যাশনালের নির্বাহী পরিচালক উইনি বিয়ানইমা কোটিপতিদের সম্পদ বৃদ্ধির এ ঘটনাকে ‘অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ব্যর্থতার’ লক্ষণ বলে মন্তব্য করেছেন।
‘যে মানুষেরা আমাদের পোশাক তৈরি, ফোন ও খাদ্য উৎপাদন করছেন তারা শোষণের শিকার হচ্ছেন। সস্তায় পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য, কর্পোরেশন এবং কোটিপতি বিনিয়োগকারীরা মুনাফার বিস্ফোরণ ঘটানোর জন্য তাদের শোষণ করছেন।’
‘রিওয়ার্ড ওয়ার্ক, নট ওয়েলথ’ শীর্ষক অপর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর বিশ্বে বিলিওনেয়ারের সংখ্যা বৃদ্ধির ঘটনা ইতিহাসের সর্বোচ্চ রেকর্ড পরিমাণে পৌঁছেছে। প্রতি দু’দিনে অন্তত একজন বিলিওনেয়ার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন।
২০১৭ সালের ক্রেডিট সুইসের গ্লোবাল ওয়েলথ ডাটাবুকের তথ্য বলছে, বর্তমানে বিশ্বে বিলিওনেয়ারের সংখ্যা ২ হাজার ৪৩ জন; এদের ৯০ শতাংশ পুরুষ।
অক্সফামের তথ্য বলছে, কর ফাঁকি, শ্রমিক অধিকার লঙ্ঘন ও স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন ব্যবস্থাই বৈশ্বিক এ অর্থনৈতিক বৈষম্যের জন্য দায়ী।
সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) বার্ষিক সম্মেলন শুরুর একদিন আগে সোমবার অক্সফাম এ প্রতিবেদন প্রকাশ করলো। গত বছর অক্সফামের একই ধরনের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিল গেইটস, মাইকেল ব্লুমবার্গসহ মাত্র ৮ জন ধনকুবেরের সম্পদের পরিমাণ বিশ্বের ৩৬০ কোটি মানুষের সম্পদের সমান।

Saturday, December 30, 2017

দুর্যোগ: জানা ও বোঝার প্রযুক্তি

বজ্রঘাত শব্দের লাতিন রূপ হচ্ছে ‘টোনার’। আর টোনার শব্দটি স্প্যানিশ রূপ ‘ত্রোনাদা’, যার মানে বজ্রগর্ভ ঝড়। অতঃপর ইংরেজি রূপ টর্নেডো। কয়েক বছর আগে ‘সিডর, আইলা’ শব্দটি ছিল অপরিচিত। বর্তমানে এসব ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের কেবল পরিচয় নয়, ভয়ংকর ছোবলের চিহ্ন নিয়ে বয়ে বেড়াবে আরো দীর্ঘদিন। বাংলাদেশ ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে প্রায় প্রতিবছরই ঘূর্ণিঝড় হওয়ার আশঙ্কা থাকে। উত্তরে হিমালয় এবং সমুদ্র উপকূল ফানেল বা চোঙাকৃতির হওয়ার জন্য এ দেশে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে পতিত হয়।
বাংলাদেশ পৃথিবীর বৃহত্তর বদ্বীপ। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, টর্নেডো, নদীভাঙন, ভূমিকম্প নিত্যসহচর। গত শত বছরে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে অসংখ্য প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়। প্রতিবছর এপ্রিল-মে (চৈত্র-বৈশাখ) মাসে টর্নেডোর প্রকোপ দেখা যায়। বাংলাদেশে এটি ঘূর্ণিঝড় বা কালবৈশাখী নামে বহুল পরিচিত। সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় টর্নেডোর আঘাতে ৩৩ জনের অধিক মানুষের প্রাণহানি হয়েছে। আহত হয়েছে সহস্রাধিক মানুষ। দুমড়ে-মুচড়ে দিয়েছে শত শত ঘরবাড়ি, স্কুল, মাদরাসাসহ বিভিন্ন ভবন ও গাছপালা। সাধারণত টর্নেডো প্রচণ্ড গতিতে ঘুরতে থাকা বাতাসকে বোঝানো হয়ে থাকে। তবে এ প্রচ- গতিতে ঘূর্ণায়মান বাতাসকে টর্নেডো হতে গেলে তাকে অবশ্যই ভূপৃষ্ঠের সঙ্গে সংযুক্ত হতে হবে। টর্নেডোর আকার-আকৃতি বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এক ফানেলের আকৃতিতে দেখা যায়। বেশির ভাগ টর্নেডোয় বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ১১০ মাইলের কম থাকে। সাধারণত কয়েক মাইল যাওয়ার পরই এসব টর্নেডোর শক্তি হ্রাস হয়। কিন্তু একটি শক্তিশালী টর্নেডোতে বাতাসের গতিবেগ ৩০০ মাইল হতে পারে। এ ধরনের শক্তিশালী টর্নেডো ১০০ কিলোমিটারেরও বেশি এলাকাজুড়ে তাণ্ডব চালায়। সব সময়ই টর্নেডো একদিকে ঘোরে অর্থাৎ উত্তর গোলার্ধে ঘড়ির কাঁটার বিপরীতে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে ঘড়ির কাঁটার দিকে ঘোরে।
টর্নেডোর ধ্বংস ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে, ১৯৭১ সালে জাপানি ও আমেরিকান বিজ্ঞানী এ স্কেল উদ্ভাবন করেন। তার নামের সঙ্গে মিল রেখে এ স্কেলের নাম রাখা হয় ফুজিতা স্কেল। ফুজিতা স্কেলের উন্নত সংস্করণটি বর্ধিত ফুজিতা স্কেল নামে পরিচিত। এ স্কেল অনুসারে যেসব টর্নেডো শুধু গাছপালা ধ্বংস করে, এগুলো ইএফও টর্নেডো। আর দালানকোঠা উপড়ে ফেলতে সক্ষম, তাহলে ইএফ৫ জাতীয় টর্নেডো। যখন শীতল আর শুকনো বাতাসের সঙ্গে সিক্ত আর উত্তপ্ত বাতাসের সংঘর্ষ বাঁধে তখন এমন এক মারাত্মক ঘূর্ণিপাকের সৃষ্টি হয় যাকে বলে ‘মেসোসাইক্লোন’; পরিবেশ অনুকূলে এলে মেসোসাইক্লোনের নিচে জমা হতে থাকে ‘ওয়াল ক্লাউড’ নামের মেঘ। আর এ ওয়াল ক্লাউডের নিচেই ব্যাপক গতি ও ক্ষমতা নিয়ে ফুঁসতে থাকে টর্নেডোর ঘূর্ণিপাক। অনেক সময় লক্ষ করা যায়, একটি মাত্র টর্নেডো থেকে অনেকগুলো টর্নেডোর সৃষ্টি হয়েছে কিংবা পুরোনো ঝড়টি নতুন ঝড়ের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে তাকে আরো শক্তিশালী করে তুলছে। এ ধরনের টর্নেডোকে বলে ‘টর্নেডো পরিবার। আবার কখনো দেখা যায় একটি বড় মাত্রার ঝড় থেকে অনেকগুলো টর্নেডোর সৃষ্টি হয়েছে। যদি কোনো রকম বিরতিহীন এ রকম একের পর এক টর্নেডো সৃষ্টি হতে থাকে; তাহলে তাকে বলে ‘টর্নেডো মরক’। টর্নেডোর আকার বা স্থায়িত্ব দিয়ে এক ধ্বংসাত্মক ক্ষমতার পরিচয় পাওয়া যায় না। অধিক জায়গা নিয়েও টর্নেডো কম ক্ষতিকর হতে পারে, বিপরীত অল্প জায়গা নিয়েও হতে পারে মারাত্মক, ভয়ংকর ইতিহাস উত্তীর্ণ।
আবহাওয়া অধিদফতরের কর্মকর্তা আয়েশা খাতুন বলেন, ‘আবহাওয়ার অনেক কিছুর মতো টর্নেডো এখনো ভালো করে বুঝে ওঠতে পারেননি বিজ্ঞানীরা। সুনামি, ভূমিকম্পেরও আগাম সংকেত দেওয়া যায় না। শক্তিশালী রাডার টর্নেডো ধরতে পারলেও প্রচার করতে করতেই তো টর্নেডো হামলে পড়বে। এখন টর্নেডোর ক্ষয়ক্ষতি মাপা হয় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কত হলো তা দেখে। এ টর্নেডোর কোনোরূপ আগাম সংবাদ দেওয়ার প্রযুক্তি বাংলাদেশে নেই। স্থানীয়ভাবে এত অল্প সময়ে এ প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটে যে, স্যাটেলাইটের মাধ্যমে তা পর্যবেক্ষণ সম্ভব নয়। কেবল ঘটে যাওয়ার পরই জানা যায়। তবে পালস-ডপলার নামে একটি রাডারের সাহায্যে টর্নেডোর পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব।’ ঝড় পূর্বাভাস কেন্দ্রের আবহাওয়াবিদ এস এম কামরুল হাসান বলেন, ‘প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, টর্নেডোটি ঊর্ধ্বাকাশের ১৫-২০ কিলোমিটার ওপর থেকে নিচে নেমে আসে। টর্নেডো যখন ভূমিতে আঘাত করে; তখন তা চোখের পলকে একের পর এক জনপদ ধ্বংস করে দেয়। বাংলাদেশে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় ২২ মার্চ ২০১৩ সালের আঘাত হানা ভয়াবহ টর্নেডো চিত্রটি প্রথম পাওয়া গেল।’
বাংলাদেশে স্পারসো (বাংলাদেশ স্পেস রিসার্চ অ্যান্ড রিমোট সেনসিং অর্গানাইজেশন) আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে এসব তথ্য সংগ্রহ করে। স্পারসোর এক তথ্য বিবরণীতে ১৮৯১ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরে মোট ১৭৪টি বড় ঘূর্ণিঝড়ের সৃষ্টি হয়। ১৯৮০ সালের আগে বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড় শনাক্তকরণের যন্ত্র বা প্রতিষ্ঠান ছিল না। সে বছরই প্রথম স্পারসো গঠন করা হয়। তারপর থেকে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে যত ঘূর্ণিঝড় গেছে সবগুলো স্পারসো পর্যবেক্ষণ করেছে। দুটি কৃত্রিম উপগ্রহ (স্যাটেলাইট) ব্যবহার করে স্পারসো। কৃত্রিম উপগ্রহদ্বয়ের মাধ্যমে ঘূর্ণিঝড়ের বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ সম্পর্কে আগাম তথ্য পাওয়া যায়। তার মধ্যে একটি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের নোয়া, যাতে দুই ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে—জিওস্টেশনারী (মহাকাশে স্থির অবস্থায় থাকে) ও পোলার অরবিটিং (ঘূর্ণয়ান) কৃত্রিম উপগ্রহ। জিওস্টেশনারী কৃত্রিম উপগ্রহ পৃথিবী থেকে ২২ হাজার ২৪০ মাইল এবং পোলার অরবিটিং স্যাটেলাইট ৫৪০ মাইল দূরে অবস্থান করে। নোয়া স্যাটেলাইট থেকে স্পারসো প্রতিদিন দুটি করে স্যাটেলাইট ছবি পায়। অন্য স্যাটেলাইটটি হচ্ছে এফওয়াইটুসি। আবহাওয়াবিষয়ক কৃত্রিম উপগ্রহ। এ দুটি কৃত্রিম উপগ্রহ ব্যবহারের ফলে আট থেকে ১০ মাইল দূরের ঘূর্ণিঝড়ের অবস্থান নির্ণয় করা যায়। স্পারসো ১২ নভেম্বর ২০০৭ থেকেই সিডরের ওপর নজর রেখেছিল। প্রতি ঘণ্টায় সিডরের অবস্থান ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়কে জানানো হচ্ছিল। আগে থেকেই প্রস্তুতি থাকার ফলে অন্যবারের ঘূর্ণিঝড়ের চেয়ে ক্ষয়ক্ষতি অনেক কম হয়েছে।
বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘বর্তমানে স্পারসো যে দুটি স্যাটেলাইট ব্যবহার করছে, তা দিয়ে অনেক আগে থেকে যেকোনো ঘূর্ণিঝড় শনাক্ত করা যাবে। তাছাড়া নোয়ার মাধ্যমে ঘূর্ণিঝড়-পরবর্তী বিভিন্ন ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ও তথ্য জানা যায়। তবে এ ক্ষেত্রে কিছু সীমাবন্ধতা রয়েছে। আকাশ মেঘলা থাকলে নোয়া ছবি তৈরি করতে অক্ষম। কারণ এ ধরনের স্যাটেলাইট অনেকটা ক্যামেরার মতো কাজ করে থাকে। আলোর প্রতিফলনকে কাজে লাগিয়ে ছবি তৈরি করে, এজন্য সূর্যের আলোর প্রয়োজন হয়। এ সমস্যার সমাধান করা যায় যদি মাইক্রোওয়েভ স্যাটেলাইট ব্যবহার করা হয়। স্পারসো এ ধরনের কোনো স্যাটেলাইট নেই। এ ধরনের কৃত্রিম উপগ্রহ স্টেশন ব্যবহারের জন্য পৃৃথক করে ভূমিতে অবস্থিত স্টেশনের প্রয়োজন পড়ে। বাংলাদেশে এমন স্যাটেলাইটের একটি গ্রাউন্ড স্টেশন বসানো হলে ঘূর্ণিঝড়, বন্যাসহ যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের তথ্য আরো সঠিকভাবে জানা যাবে বলে আবহাওয়াবিজ্ঞানীরা মনে করেন।
যদিও বৈশাখ নববর্ষের বারতা নিয়ে আসে, তবে তার মাতাল হাওয়ার তোড়ে উড়িয়ে নিয়ে যায় হাজারও মানুষের স্বপ্ন। এ যেন স্বপ্ন ও দুঃস্বপ্নের এক লুকোচুরি খেলা। আর এই লুকোচুরি খেলার মাঝেই বেড়ে উঠেছে পাললিক মাটিতে গড়া আমাদের জীবন। আমরা যেন অনেকটা বেতবৃক্ষের মতো। মচকাতে জানি, ভাঙতে শিখিনি। গত ২২ মার্চ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিনটি গ্রামের ওপর দিয়ে মাত্র ১৫ মিনিট স্থায়ী ভয়াবহ টর্নেডো বা ঘূর্ণিঝড়ের ভয়াবহতা নিয়ে আখউড়া আমোদাবাদ দীঘি গ্রামের বয়োবৃদ্ধ মোতাহের আলী বলেছেন, জীবনে এমন ঘটনা দেখেনি। চোখের পলকেই সব কিছু ধ্বংস হয়ে গেল। এ যেন এক মহাবিস্ময়!
লেখক :ইয়াসমীন রীমা ;সাংবাদিক ও কলামিস্ট

Sunday, November 12, 2017

দ্রব্যমূল্য কেন নিয়ন্ত্রণহীন

দ্রব্যমূল্যের দৃশ্যত কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। চাল, তেল, পেঁয়াজ, আদা, রসুনসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। চাল ও সবজির দাম বৃদ্ধির অজুহাত হিসেবে ব্যবসায়ীরা বন্যার কথা বলছেন। কিন্তু কিছু পণ্য আছে সরবরাহে ঘাটতি না থাকার পরও দাম বেড়ে গেছে। অর্থাৎ আড়াল থেকে কলকাঠি নাড়াচ্ছে সিন্ডিকেট। আর এর মাশুল গুনছে সাধারণ মানুষ।
ব্যবসায়ীদের হাতে দ্রব্যমূল্যের নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ার পেছনে সরকারি প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) দুর্বলতাকেও অনেকে দায়ী করেন। আমরাও মনে করি, টিসিবি ক্রমেই গুরুত্ব হারাচ্ছে। হাতেগোনা কিছু পণ্য মাঝেমধ্যে তারা খোলাবাজারে বিক্রি করে, যা বিদ্যমান বিশাল বাজারব্যবস্থায় কোনো প্রভাবই ফেলতে পারে না। টিসিবির দুর্বলতার জন্য নিজস্ব তহবিলের অভাবের সঙ্গে আমলাতান্ত্রিক জটিলতাকেও দায়ী করা হয়। সরকার কেন টিসিবিকে সবল করার পদক্ষেপ নিচ্ছে না? বিষয়টি যেন সবারই জানা। এ দেশে রাজনীতিক আর আমলারা শুধু তাদের নিজ নিজ পেশায় নিজেদের নিয়োজিত রাখতে পারেননি, তারা তাদের পেশার পাশাপাশি বাণিজ্যেও জড়িয়েছেন প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষে। তবে ঢালাওভাবে সবাই নয়। আর এই একটি কারণেই দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের বাইরে থেকে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সমাজ বিশ্লেষকরা। তারা মনে করছেন, একই সঙ্গে রক্ষক ও ভক্ষকের ভূমিকায় থাকলে (বিশেষ করে রাজনীতিক ও আমলা) যা হওয়ার তাই হচ্ছে।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পাশাপাশি বাড়ছে বাসাভাড়া, পরিবহন-ভাড়া, চিকিৎসা ও শিক্ষা খাতের ব্যয়। সরকারি-বেসরকারি সেবার দামও বাড়ছে। সেই অনুপাতে বাড়ছে না মানুষের আয়। ফলে জীবনযাত্রার মানেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য মতে, ১৬ কোটি মানুষের দেশে ৯ কোটি ১০ লাখই অতিদরিদ্র, দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত শ্রেণির। বাজার অস্থিতিশীল হওয়া মানেই দেশের বেশির ভাগ মানুষের ওপর চাপ পড়া। তাই সরকারকে বাজারে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাই শুধু নয়, কর্মসংস্থানও বাড়াতে হবে। তখন উৎপাদন বাড়বে, বাড়বে ক্রয়ক্ষমতা। আয় বাড়লে মূল্যস্ফীতির আঘাতও হয় সহনীয়।
তৃতীয় বিশ্বের একটি উন্নয়নশীল দেশ বাংলাদেশ। জনসংখ্যার বেশির ভাগ এখানে দারিদ্র্যসীমার মধ্যে বাস করে। বর্তমানে দেশের অন্যতম আলোচ্য বিষয় নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি। কালোবাজারি, মুনাফাখোর, মজুদদার প্রভৃতির কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় ও অপরিহার্য দ্রব্যগুলোর মূল্যবৃদ্ধি পাচ্ছে প্রতিদিন এবং ক্রমে এসব পণ্য সংগ্রহ করা কঠিনতর হচ্ছে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য। জনজীবন আজ বিপর্যস্ত, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি মানুষকে অর্ধাহার ও অনাহারে দিন কাটাতে বাধ্য করছে। মানুষের একটু ভালোভাবে বাঁচার দাবি আজ সর্বত্র। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি তাদের প্রতিকূলে। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সীমাকে অতিক্রম করে অশ্বগতিতে বেড়ে চলছে ব্যয়ের খাত।
দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে জীবনযাত্রার সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। একটি পরিবার কীভাবে তাদের দৈনন্দিন জীবনকে নির্বাহ করবে তা নির্ভর করে তাদের আয়, চাহিদা এবং দ্রব্যমূল্যের ওপর। প্রয়োজনীয় প্রতিটি পণ্যের মূল্য যখন সহনীয় পর্যায়ে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকে, তখন তাদের জীবন কাটে স্বস্তিতে। অন্যদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য যখন সাধারণ মানুষের আর্থিক সংগতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে যায়, তখন দরিদ্র এবং অতিদরিদ্র পরিবারে শুরু হয় অশান্তি। তাই দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে একদিকে জনজীবনে নেমে আসে কষ্টের কালো ছায়া। অন্যদিকে মুনাফাখোর, কালোবাজারিদের কারণে দেশে বিরাজ করে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি।
পণ্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে বর্তমানে ন্যায়সংগত মূল্যে কোনো পণ্যই আর পাওয়া যায় না। প্রতিটি পণ্যেই যেন অধিক মূল্যের আগুন জ্বলছে দাউ দাউ করে। অথচ এক বা দুই দশক আগেও এই অবস্থা ছিল না। মানুষ জীবন কাটাত সাধ্যের মধ্যে ভালো থেকে। শায়েস্তা খাঁর আমলে টাকায় আট মণ চালের কথা যেন সময়ের রূপকথা। ব্রিটিশ শাসনামলেও দেশের দ্রব্যমূল্য ছিল নিয়ন্ত্রিত অবস্থায়। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর দেশের অবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন হলেও দ্রব্যের মূল্য সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে ছিল। সামাজিক নিরাপত্তার সঙ্গে খাদ্য নিরাপত্তার সম্পর্ক রয়েছে। বেঁচে থাকার তাগিদ থেকেও কেউ কেউ অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ে। আমরা আশা করব, দৃশ্য ও অদৃশ্যমান সব সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নিশ্চিত করা হবে সাধারণ ও নিম্নআয়ের মানুষের ভালোভাবে বেঁচে থাকার নিরাপত্তা।
লেখক:সাবরিনা শুভ্রা; বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, গবেষক ও কলামিস্ট,

Wednesday, November 8, 2017

জঙ্গিবাদ ঠেকাতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কঠোর হচ্ছে 



শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জঙ্গিবাদ ঠেকাতে চলমান বিভিন্ন প্রক্রিয়াকে আরো জোরদার করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। হাতে নিচ্ছে সময়োপযোগী বিভিন্ন কার্যক্রম। এ লক্ষ্যে মন্ত্রণালয় ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেরোরিজম এবং ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় করবে। জঙ্গি সম্পৃক্ততায় অভিযুক্ত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের গ্রেফতারের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইরেজি মাধ্যমের বিদ্যালয়সহ প্রায় ১৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শিগগিরই কঠোর পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। চলতি সপ্তাহে ঢাকার ইংরেজি মাধ্যমের তিনটি বিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মন্ত্রণালয়। দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যায়ক্রমে জঙ্গিবিরোধী সভার আয়োজন করবে মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে।
জঙ্গিবাদে উসকানি দেওয়ার অভিযোগ ওঠায় আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে মাদ্রাসার পাঠ্যবইও বদলানো হচ্ছে। বিভিন্ন শ্রেণির পাঠ্যবই থেকে জিহাদবিষয়ক উগ্র মতাদর্শের লেখা বাদ দিয়ে নতুন রচনা সংযোজন করে ছাপানো হচ্ছে নতুন বই। উগ্র ব্যাখ্যা থাকা মাদ্রাসার সহায়ক ও গাইডবই নিষিদ্ধ করতে কঠোর ধারা যোগ করে প্রণয়ন করা হচ্ছে শিক্ষা আইন। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশ অনুযায়ী মাদ্রাসার নতুন বই পর্যবেক্ষণে বিশেষজ্ঞ কমিটির সার্বক্ষণিক নজরদারি থাকবে। প্রয়োজনে যেকোনো সময় পাঠ্যবইয়ের কোনো রচনা বদলানোর সুপারিশ করতে পারবে। এই কমিটিতে স্বরাষ্ট্র, শিক্ষাসহ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি থাকবেন।
সূত্র জানায়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদফতর (ডিআইএ) ৩৬ হাজার সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন কার্যক্রমকে জোরদার করছে। ডিআইএর মাধ্যমে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জঙ্গি কার্যক্রমের সংশ্লিষ্টতা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে নজরদারিতে রাখছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে জঙ্গিবাদবিরোধী সেল খোলা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। নির্দেশের পরও যারা সেল খোলেনি, সেগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জঙ্গি সংশ্লিষ্টতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ বাতিল করে শাস্তির মুখোমুখি করার উদ্যোগ নিয়েছে ইউজিসি।
জানতে চাইলে দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষাসচিব (অতিরিক্ত শিক্ষাসচিব) মহিউদ্দিন খান এ প্রসঙ্গে প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জঙ্গিবাদ চর্চা যেন না হয়, সেজন্য দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বেশি তদারকি ও নজরদারি করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও তাদের পদ্ধতিতে সন্দেহভাজন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজে নজরদারি ও অনুসন্ধান চালাচ্ছে।’ নাম প্রকাশ না করার শর্তে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দুই কর্মকর্তা বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ১০ দিনের বেশি কোনো
শিক্ষার্থী অনুপস্থিত থাকলে তা জানানোর জন্য গত বছর কড়া বার্তা দেয় মন্ত্রণালয়। এ নির্দেশ মানায় তেমন গুরুত্ব দিচ্ছে না অনেক প্রতিষ্ঠান। মাসের পর মাস শিক্ষার্থীরা অনুপস্থিত থাকলেও তা মন্ত্রণালয় ও পুলিশকে জানাচ্ছেন না সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা। সাম্প্রতিক সময়ে এভাবে আত্মগোপনে থেকে জঙ্গি প্রশিক্ষণ নিয়ে হামলা চালিয়েছেন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাবেক শিক্ষার্থীরা। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের বিশেষ নজর রাখার নির্দেশনা দেওয়া থাকলেও তারা রাজনৈতিক কর্মকান্ডের ওপর বেশি নজর রাখেন। সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ না থাকায় জঙ্গিবাদ সম্পর্কিত তথ্য আদান-প্রদান অনেকটা একমুখী হয়ে পড়ে।’
যোগাযোগ করলে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এ কে এম ছায়েফউল্যা বলেন, ‘মাদ্রাসার পাঠ্যবইয়ের যেসব স্থানে বিতর্কিত পাঠ, বিশেষ করে জঙ্গিবাদে উৎসাহিত করার মতো বিষয় ছিল, তা বাদ দেওয়া হয়েছে। জঙ্গিবাদবিষয়ক জাতীয় কমিটির পরামর্শের ভিত্তিতে আমরা মাদ্রাসার কোরআন-হাদিস, আরবি ও ফিকহবিষয়ক বিভিন্ন পাঠ্যবই যৌক্তিক মূল্যায়ন করেছি।’
অভিযুক্ত ও দায়ী প্রতিষ্ঠান : ১৪টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, ৯টি ইংরেজি মাধ্যমের স্কুল ও সাতটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় জঙ্গি সৃষ্টির উৎস হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে গত বছর শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়। গত চার বছরে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কমপক্ষে ৭২ জন ছাত্র ও শিক্ষকের বিরুদ্ধে জঙ্গি কর্মকান্ডে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গত মঙ্গলবার কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া রাজধানীর লেকহেড গ্রামার স্কুলও ছিল জঙ্গিবাদের কেন্দ্রস্থল। বিভিন্ন সময়ে এ প্রতিষ্ঠানের অন্তত ১২ জন শিক্ষকের জঙ্গিবাদে যুক্ত থাকার প্রমাণ পায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
জঙ্গি কার্যক্রমে মদদের দায়ে লেকহেড গ্রামার স্কুল বন্ধের নির্দেশ গত রোববার দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। দেশের নিষিদ্ধ তিনটি জঙ্গিগোষ্ঠীর সঙ্গে স্কুলটির সাবেক অধ্যক্ষসহ শিক্ষকদের কর্মকর্তার যোগসূত্র পাওয়া যায়। এর মধ্যে দুজন শিক্ষক ছিলেন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের মাতৃসংগঠন জামায়াতুল মুসলেমিনের ও দুজন হিযবুত তাহ্রীরের সঙ্গে যুক্ত। ঢাকার হলি আর্টিজানে হামলাকারীদের প্রশিক্ষণদাতা সাবেক মেজর জাহিদুল ইসলামও স্কুলটির প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে চাকরি করতেন। গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর রাজধানীর রূপনগরে জঙ্গিবিরোধী এক অভিযানে তিনি মারা যান। ভারতের বিতর্কিত ইসলামী বক্তা জাকির নায়েকের মতাদর্শ পড়ানোয় দেশের পিস স্কুলগুলোও গত বছর বন্ধ করে দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
৩৫ পাঠ্যবই থেকে উসকানিমূলক লেখা বাদ : বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে মাদ্রাসার ৩৫টি বই পরিশুদ্ধরূপে আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে আসছে। জাতীয় শিক্ষানীতিতে বর্ণিত মাদ্রাসার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অনুসরণ করে বইগুলো থেকে ধর্মীয় উসকানিমূলক লেখা বাদ দেওয়া হয়েছে। বিতর্কিত লেখার পরিবর্তে নতুন আলোচনা যুক্ত হয়েছে। কোনটি জিহাদ আর কোনটি জঙ্গিবাদ, তা স্পষ্ট করে ২০১৮ সালের শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ করা হচ্ছে।
এর আগে প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত যেসব পাঠ্যপুস্তকে জঙ্গিবাদ-সংশ্লিষ্ট বিষয় ছিল, সেসব বই জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) কমিটি গঠন করে যাচাই করে। যাচাইয়ে কয়েকটিতে উসকানিমূলক ও অপব্যাখ্যা করার মতো তথ্য মিলে। মাদ্রাসার পাঠ্যবইয়ে জঙ্গিবাদ বিষয়ে পাঠ্য আছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে গত বছরের ২৪ এপ্রিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি পাঠানো হয়। চিঠিতে মাদ্রাসার কোরআন, হাদিস, সংবিধান ও জাতীয় চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বিষয় এবং কোনো রাজনৈতিক দল সম্পর্কে লেখা প্রবন্ধ বা রচনা বাদ দেওয়ার নির্দেশনা ছিল।
এর পরিপ্রেক্ষিতে মাদ্রাসা বোর্ড কর্তৃপক্ষ প্রথম থেকে দশম শ্রেণির ৩৫টি বই মূল্যায়নের উদ্যোগ নেয়। এ লক্ষ্যে আটটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠিত হয়। প্রতিটি কমিটিতে পাঁচজন করে মোট ৪০ জন সদস্য কাজ করেন। কমিটির দেওয়া প্রতিবেদনের আলোকে বিভিন্ন বইয়ে পরিবর্তন আনা হয়। এসব বই আগামী বছর শিক্ষার্থীদের হাতে যাচ্ছে।
বই সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে কমিটি : নতুন করে মুদ্রিত মাদ্রাসার পাঠ্যবই পর্যক্ষেণের জন্য প্রথমবারের মতো বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন হচ্ছে। কমিটির সদস্যরা বইগুলোতে নজর রাখবেন। পাঠ্যবইয়ে জঙ্গিবাদসহ বিতর্কিত আর কোনো পাঠ থাকলে তা পরিবর্তনে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়াই কমিটি গঠনের মূল লক্ষ্য। ১৫ সদস্যের এ কমিটি গঠন করার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় মাদ্রাসা বোর্ডকে নির্দেশ দিয়েছে। স্বরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অন্তত ১৫ জন প্রতিনিধি কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হবেন। সব মিলিয়ে ৩০ সদস্যের কমিটি হতে পারে। আগামী শিক্ষাবর্ষের শুরুতে শিক্ষার্থীদের হাতে পাঠ্যবই পৌঁছে দেওয়ার আগেই কমিটি গঠন হতে পারে বলে সূত্র জানায়।
উসকানিমূলক গাইডবই নিষিদ্ধ হচ্ছে : মাদ্রাসার বিভিন্ন শ্রেণির পাঠ্যবইয়ের সহায়ক হিসেবে লেখা পাঁচটি প্রকাশনীর গাইডবইয়ে জঙ্গিবাদকে উসকে দেওয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা এ অভিযোগ করে আসছেন। সেগুলোতে ধর্মকে অপব্যাখ্যা করা হচ্ছে। কথিত সহযোগী বা গাইডবইয়ের নামে চিহ্নিত পাঁচটি প্রকাশনীর বইয়ে উগ্র বাক্য আছে বলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে গত বছর জমা দেওয়া এনসিটিবির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, আল ফাতাহ, আল ফালাহ, ইসলামিয়া, ইসলামিয়া কুতুবখানা ও আল ইসলাম প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত গাইড ও বইয়ে জিহাদ বিষয়ে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেখান থেকে জঙ্গিবাদ উসকে যেতে পারে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় মনে করে, শিক্ষা আইনের খসড়ায় মাদ্রাসার পাঠ্যবইয়ের নামে সহযোগী নোট ও গাইডবইকে নিষিদ্ধ করা হচ্ছে। আইনটি শিগগিরই প্রণয়ন হবে। ফলে বাজারে গাইডবই থাকবে না।
লেখক:হাসান শান্তনু 

রোহিঙ্গা সংকট 

দ্বিপক্ষীয় আলোচনা মিয়ানমারের নতুন ফাঁদ


দ্বিপক্ষীয় আলোচনা মিয়ানমারের নতুন ফাঁদ।
নানা টালবাহানায় বারবার পিছু হটছে মিয়ানমার। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে কোনো সদিচ্ছাই দেখা যাচ্ছে না দেশটির। নানা ধরনের আলোচনার নামে কালক্ষেপণের কৌশল নিয়েছে। নামমাত্র কিছু রোহিঙ্গা ফেরত নিয়ে চাইছে আন্তর্জাতিক চাপ প্রশমনের ও সংকটকে দীর্ঘায়িত করতে। এরই কৌশল হিসেবে এখন ত্রি বা বহুমুখী আলোচনার পরিবর্তে সংকট সমাধানের জন্য কেবলমাত্র বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা করতে চাইছে। এ জন্য দেশটি রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর সেনাবাহিনীর সহিংসতা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের দেওয়া বিবৃতিরও ঘোর আপত্তি জানিয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকটের অবসানে গত সোমবার নিরাপত্তা পরিষদে আলোচনার পর সর্বসম্মতভাবে একটি বিবৃতি (প্রেসিডেন্সিয়াল স্টেটমেন্ট) দেয়। বিবৃতিতে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর সেনাবাহিনীর সহিংসতা বন্ধ করার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে পরিষদ। কিন্তু সেটি মেনে নিতে পারছে না মিয়ানমার। দুই দিন পর গতকাল বুধবার এক পাল্টা বিবৃতি দিয়ে জাতিসংঘের বিবৃতিতে আপত্তি জানান দেশটির স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চি। তাতে প্রত্যাবাসন প্রশ্নে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনায় বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে এবং বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের দ্বিপক্ষীয় চেষ্টাতেই এ সমস্যার সমাধান আসতে পারে বলে মনে উল্লেখ করেন তিনি।
অথচ বাংলাদেশসহ আন্তর্জাতিক মহল চাইছে, মিয়ানমারের সঙ্গে ত্রি বা বহুমুখী কূটনীতির মাধ্যমে সংকটের সমাধান। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও সংকটের স্থায়ী সমাধানে বিভিন্ন চুক্তিতে জাতিসংঘসহ অন্যান্য রাষ্ট্রকে সাক্ষী রাখতে। বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের ব্যাপারে মিয়ানমারের সঙ্গে যেকোনো আলোচনায় জাতিসংঘকে অবশ্যই রাখার পক্ষে আন্তর্জাতিক মহল। কারণ সংস্থাটির কাছে রোহিঙ্গারা যে মিয়ানমারের বাসিন্দা ও সেখানকার নাগরিক এ-সংক্রান্ত যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণাদি রয়েছে।
নিরাপত্তা পরিষদের বিবৃতিতে মিয়ানমারের বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের ইচ্ছা পোষণকে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে না নিতে ও সংকটকে প্রলম্বিত করার ‘নতুন ফাঁদ’ বলে মনে করছেন কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, মিয়ানমার নতুন ফাঁদ পেতেছে। তাদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে যে সমাধান সম্ভব নয়, তার উদাহরণ দেশটি নিজেই দিয়েছে। কারণ এর আগে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে করা ১৯৯২ সালের চুক্তি নিজেরাই ভঙ্গ করেছে দেশটি। এমনকি নতুন করে পালিয়ে আসা ছয় লাখের বেশি রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে এবং সংকট সমাধানে গত দুই মাসেরও বেশি সময়ে কোনো সদিচ্ছার প্রমাণ দেয়নি দেশটি। নাগরিকত্ব নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি করছে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের সঙ্গে দুই দফা আলোচনায় নেওয়া প্রস্তাবের একটিও মানেনি দেশটি। উল্টো রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশকে দুষছে। রোহিঙ্গা নির্যাতনকে বৈধতা দিতে ও আন্তর্জাতিক চাপ প্রশমনে রাশিয়া, চীন ও ভারতকে পক্ষে রাখতে কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে। এমনকি বিশ্ব জনমতকে উপেক্ষা করে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন অব্যাহত রেখেছে। প্রতিদিনই বাংলাদেশে পালিয়ে আসছে রোহিঙ্গারা।
হঠাৎ করেই মিয়ানমার দ্বিপাক্ষিক আলোচনার কথা কেন বলছে-জানতে চাইলে বিশ্লেষকরা বলেন, প্রধান কারণ আন্তর্জাতিক চাপ। দ্বিপাক্ষিক আলোচনার নামে সময়ক্ষেপণ করা গেলে আন্তর্জাতিক চাপ প্রশমন হবে। বিভিন্ন দেশের মিয়ানমারের উৎসাহে ঘাটতি পড়বে। অথচ শুরু থেকেই বাংলাদেশ বিভিন্ন ফোরামে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার পাশাপাশি বহুপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের প্রস্তাব দিয়ে আসছে।
এ ব্যাপারে পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক বলেন, রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক মহলের সহায়তা চাওয়ার পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় আলোচনার দ্বারও বাংলাদেশ উন্মুক্ত রেখেছে। ছলচাতুরির আশঙ্কা থাকলেও মিয়ানমারের আহ্বানে বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় গেছে। আমরা জানি এটা থেকে তারা সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করবে। সে জন্য আলোচনায় আন্তর্জাতিক মহলকেও চাইছি। তারাও সরব আছে। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা চাই।
মিয়ানমারের নেওয়া এই দ্বিপক্ষীয় পদক্ষেপের পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা এবং আইওএম দাতারা যে সম্মেলনের উদ্যোগ নিয়েছে; সেখানে মিয়ানমার দেখাতে চাইছে সংকট সমাধানে তারা উদ্যোগ নিয়েছে। এ ছাড়া চীনের পরামর্শেই মিয়ানমারের এ পদক্ষেপ। এর আগে নিরাপত্তা পরিষদে দেওয়া চীনা প্রতিনিধির ভাষণে সেই ইঙ্গিত ছিল। গত ২৫ অক্টোবর হঠাৎ করেই বাংলাদেশ সফরে এসে দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় চীনের বিশেষ দূত সান গোসিয়াং বলেন, মিয়ানমার ও বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধান চায় চীন। দ্বিপক্ষীয় আলোচনার নামে সংকট সমাধান প্রলম্বিত আরেকটি নেতিবাচক দিক হচ্ছে, যে তাতে রোহিঙ্গা সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের সম্ভাবনা হ্রাস পাবে। দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে মিয়ানমার বাংলাদেশের পক্ষে দাঁড়ানো অন্যান্য দেশ ও সংস্থাকে নিষ্ক্রিয় করে দিতে চাইছে। যেন ভবিষ্যতে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ একাকী হয়ে পড়ে।
বিশ্লেষকরা আরো বলছেন, আন্তর্জাতিক সমাজের পক্ষ থেকে যেসব করণীয় চিহ্নিত করা হয়েছিল, সে বিষয়ে মিয়ানমার এখন পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এমনকি উল্টো প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। জাতিসংঘের মহাসচিব তিনটি পদক্ষেপের কথা বলেছিলেন, প্রথমত অবিলম্বে সেনা অভিযান বন্ধ করা; মিয়ানমারের অভ্যন্তরে মানবিক সহায়তা দেওয়ার পথে বাধাগুলো অপসারণ করা এবং সবার নিরাপদ, স্বতঃপ্রণোদিত, সম্মানজনক প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থা করা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার ভাষণে যে পাঁচ দফা প্রস্তাব দিয়েছিলেন, সেখানেও সহিংসতা বন্ধ করার কথা বলেছিলেন। কিন্তু এ-যাবৎ এই বিষয়ে মিয়ানমারের পক্ষ থেকে কোনো ঘোষণার লক্ষণ নেই। সেই অবস্থায় জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর প্রত্যক্ষ, কার্যকর ও নীতিনির্ধারণ পর্যায়ে সংশ্লিষ্টতা ছাড়া দ্বিপক্ষীয় আলোচনা ও পদক্ষেপ বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক হবে বলে মনে হয় না।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বলেন, মিয়ানমার শুরু থেকেই দ্বিপাক্ষিক আলোচনার কথা বলছে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে অনিশ্চয়তার তৈরি করার জন্য। দ্বিপাক্ষিক আলোচনা চলবে অসুবিধা নেই। কিন্তু আন্তর্জাতিক চাপ অব্যাহত রাখতে হবে। নিরাপত্তা পরিষদকে শুরু বিবৃতি দিলেই হবে না। সংকট সমাধানে মিয়ানমারকে বাধ্য করতে রেজুলেশন চাই। চাপের মুখে মিয়ানমার নানা আলোচনার কথা বলবে। কিন্তু সংকট সমাধানে বাধ্য করতে শক্ত অবস্থান লাগবে।
এই সাবেক কূটনীতিক বলেন, আমরা দ্বিপাক্ষিক আলোচনা চাই। কিন্তু দুই দেশের মধ্যে যেসব চুক্তি হবে, সেগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অন্য দেশকে রাখতে হবে। চুক্তি কতটুকু বাস্তবায়ন হচ্ছে, তার দেখভালো জাতিসংঘ থাকবে।
মিয়ানমারের বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মেজর (অব.) ইমদাদুল ইসলাম বলেন, নিরাপত্তা পরিষদের বিবৃতিতে মিয়ানমারের পাল্টা প্রতিক্রিয়া পরিস্থিতি জটিল করল। অথচ নিরাপত্তা পরিষদের এই বিবৃতি এমন শক্ত কোনো অবস্থান নয়। এটি কোনো ধরনের প্রস্তাবও নয়। তার মানে মিয়ানমার চাইছে না রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক মহল তৎপর থাক। দ্বিপাক্ষিক আলোচনার কথা বলে মিয়ানমার রোহিঙ্গা সংকট সমাধানকে জটিল ও প্রলম্বিত করতে চাইছে।
এই সাবেক কূটনীতিক বলেন, দ্বিপাক্ষিক আলোচনার দ্বার তো খোলাই ছিল। মিয়ানমারই সেখানে অনাস্থা তৈরি করেছে। এখন পর্যন্ত তারা জয়েন্ট ওয়ার্কিং কমিটি তৈরি করেনি। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশ যে নতুন চুক্তির প্রস্তাব দিয়েছে, সে নিয়েও কোনো কথা বলছে না। উল্টো রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে দেরির জন্য বাংলাদেশকে দুষছে। বলছে বাংলাদেশ নাকি দাতা সংস্থার সহযোগিতার জন্য প্রত্যাবাসন চাইছে না। এর আগে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মিয়ানমার সফরের সময় যেসব আলোচনা হয়েছিল, পরে মিয়ানমার তাদের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে সেগুলো রাখেনি। ফলে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা চলুক, অসুবিধা নেই। কিন্তু সংকট সমাধানে মিয়ানমারকে বাধ্য করতে হলে বহু পক্ষকে রাখতে হবে। যে পথেই যাক, কফি আনান কমিশনকে ধরেই আলোচনা চালাতে হবে। কারণ সেটি মিয়ানমারেরই করা। কমিশনের প্রস্তাবে সংকট সমাধানের সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।

Tuesday, November 7, 2017

সংকট সমাধানে প্রয়োজন সমঝোতা  

অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের আভাস


একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেন্দ্র করে নির্বাচনী রাজনীতিতে গতি-প্রকৃতির বদল হচ্ছে প্রতি সপ্তাহেই। রং বদলাচ্ছে রাজনীতির। সব দলের অংশগ্রহণে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের বিষয়ে কখনো আশা জাগছে আবার কখনোবা দেখা দিচ্ছে নিরাশাও। এক সপ্তাহ আগেও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলাকে কেন্দ্র করে রাজনীতি যতটা গুমোটের দিকে যাচ্ছিল, গত এক সপ্তাহে, বিশেষ করে এই সপ্তাহের শেষের দিকে সেখানে ইতিবাচক কিছু আভাস মিলেছে। নির্বাচন নিয়ে আশাব্যঞ্জক তথ্য মিলেছে।
গত এক সপ্তাহের রাজনীতি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পাশাপাশি দেশি-বিদেশি কূটনৈতিক মহলের পক্ষ থেকেও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। নির্বাচনে অংশগ্রহণের ব্যাপারে বিভিন্ন বিষয়কে কেন্দ্র করে মুখোমুখি অবস্থানে থাকা আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পক্ষ থেকেও কিছুটা নরম সুরেই কথা বলতে শোনা গেছে। বিশেষ করে ক্ষমতাসীনদের অনেক বেশি সংযত থাকতে দেখা গেছে।
সর্বশেষ ৭ নভেম্বর উপলক্ষে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিএনপির সমাবেশকে কেন্দ্র করে রাজনীতিতে যে উত্তাপ ছড়ানোর আশঙ্কা ছিল, ‘সমাবেশের অনুমতির আশ্বাস পাওয়া গেছে’—দলের পক্ষ থেকে এমন তথ্য জানানোর পরিপ্রেক্ষিতে সেই উত্তাপ কিছুটা হলেও প্রশমিত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে রাজনীতির মাঠে ক্ষমতাসীনদের অনেক বেশি সংযত মনে হচ্ছে। তেমনি ৭ নভেম্বর সংসদ ভবনে চলমান সিপিএ সম্মেলন উপলক্ষে নিরাপত্তার কারণে বিএনপিকে জিয়ার মাজারে যেতে না দেওয়া হলেও দলের পক্ষ থেকে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখানো হয়নি। এর আগে গত ২ নভেম্বর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ বলেছেন, যত প্রতিকূল পরিবেশই আসুক না কেন, বিএনপি আগামী নির্বাচনে যাবে। এমনকি এই সরকার বিএনপির সঙ্গে সমঝোতায় আসতে বাধ্য হবে বলেও জোর দিয়েছেন তিনি। এর প্রত্যুত্তরে পরদিন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বিএনপিকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, আগামী নির্বাচনে যদি না আসে, তাহলে তাদের অস্তিত্ব হারিয়ে যাবে। এমনকি খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলার ঘটনায় এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ও বিএনপি প্রতিহিংসামূলক কোনো কর্র্মসূচিতে যায়নি। এ ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেওয়ার যে সিদ্ধান্ত, তা রাজনীতির ভাষায় ‘সংযত আচরণ’ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
অন্যদিকে গত এক সপ্তাহে দেশি-বিদেশি কূটনীতিতেও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের প্রসঙ্গ এসেছে। গত ২ নভেম্বর ‘জাতিসংঘ সবার অংশগ্রহণে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চায়’ বলে মন্তব্য করেছেন সংঘের বিদায়ী আবাসিক সমন্বয়কারী রবার্ট ওয়াটকিন্স। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশে এখন নির্বাচনের সুবাতাস বইছে। জাতিসংঘ প্রত্যাশা করে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনটি কেবল অংশগ্রহণমূলক নয়, এটি অবাধ এবং সুষ্ঠু হবে। এরপর গত সোমবার খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎকালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনীতিবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি টমাস শ্যাননের কাছেও বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তবে শর্ত হিসেবে বিদ্যমান সংসদ ভেঙে দিয়ে একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীন সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা বলেছেন দলের নেতারা।
চলমান রাজনীতির এমন প্রেক্ষাপটকে আগামী নির্বাচনের জন্য ইতিবাচক আভাস বলে মনে করছেন নির্বাচন ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, নির্বাচন নিয়ে নানা বিতর্ক থাকলেও আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সাম্প্রতিক রাজনীতিতে কিছুটা হলেও আশা জেগেছে। সরকার বলছে, তারা অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চায়। বিএনপিও যেতে চাইছে নির্বাচনে। এখন প্রশ্ন হলো নির্বাচন ঘিরে দেখা দেওয়া বিতর্কের সমাধান কীভাবে হবে। সেটা ভাবতে হবে সবাইকে। সংকট সমাধানে সরকারের সদিচ্ছা প্রয়োজন।
প্রশ্ন উঠেছে-নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মূল দুই ইস্যুতে দেখা দেওয়া সংকটের সমাধান হবে কী করে? একদিকে আওয়ামী লীগ বলছে, বর্তমান সরকারের অধীনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নির্বাচন হবে। সংবিধান অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই নির্বাচন করবে নির্বাচন কমিশন। অন্যদিকে বিএনপির দাবি, বিদ্যমান সংসদ ভেঙে দিয়ে সহায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন। ফলে নির্বাচনের জন্য চলমান রাজনীতিতে যে ইতিবাচক আভাস মিলছে, সেটি শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখবে তো?—এমন প্রশ্নও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে।
এ বিষয়ে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ছহুল হোসাইন বলেন, সংকট সমাধানে প্রয়োজন সমঝোতা। আলোচনা দরকার। এখন যে প্রেক্ষাপট তাতে সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন সম্ভব এবং সেটিই হবে। কিন্তু সব দলকে নির্বাচনে আনতে হলে আলোচনা দরকার। এ ক্ষেত্রে সরকারকেই উদ্যোগী হতে হবে। তবে বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলেরও ভূমিকা নিতে হবে।
অবশ্য গত ১৪ অক্টোবর শনিবার সরকারি বাসভবন গণভবনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনিবাহী সংসদ ও উপদেষ্টা পরিষদের যৌথসভার শুরুতেই দেওয়া প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার বক্তব্যে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ব্যাপারে সরকারের সদিচ্ছার প্রমাণ মিলেছে। সেদিন তিনি বলেন, ‘নির্বাচন যাতে অবাধ ও সুষ্ঠু হয়, আমরা সেটাই চাই। আগামীতে নির্বাচন হবে, সুষ্ঠু নির্বাচন যাতে হয় আলোচনা করে তার একটা পথ বের করব। আমরা চাই, মানুষ মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগ করবে। যার যার প্রতিনিধি সে সে বেছে নেবে।’
বর্তমান রাজনীতিকে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য ইতিবাচক বলে মনে করছেন সাবেক নির্বাচন কমিশনার ছহুল হোসাইন। তিনি বলেন, কিছু নেতিবাচক ঘটনা থাকলেও রাজনীতিতে সমঝোতার একটা পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে; যা আমাদেরকে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনটি সব দলের অংশগ্রহণমূলক হওয়ার বিষয়ে আশাবাদী করে তুলছে। সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ ও পর্যবেক্ষণ করে মনে হচ্ছে, সরকার ও বিরোধী দল সবাই চাচ্ছে আগামী নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে ও সমঝোতার মধ্যে অনুষ্ঠিত হোক। সরকার থেকেও এ বিষয়ে বলা হয়েছে ও পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিএনপিও নির্বাচনে অংশ নেবে বলেই দলটির বিভিন্ন নেতার বক্তব্যে মনে হচ্ছে। নির্বাচন হতেই হবে, এর কোনো বিকল্প নেই। ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করার জন্য সরকারের কাছ থেকে অনুমতি পাবে বলে বিএনপি একটা আশ্বাস পেয়েছে, যা অবশ্যই রাজনীতিতে ইতিবাচক। আমিও দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আগামী নির্বাচন সব দলের অংশগ্রহণে হওয়া উচিত। এই নির্বাচন বিশ্লেষক আরো বলেন, নির্বাচনী রাজনীতিতে বর্তমানে যে সমঝোতার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, তা ধরে রাখতে প্রয়োজন সব রাজনৈতিক দলের সদিচ্ছা। গণতন্ত্রকে সমুন্নত রাখতে রাজনীতিবিদদের আন্তরিক সদিচ্ছা থাকতে হবে।
নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির প্রধান তিন দাবি অসাংবিধানিক। এর মধ্যে নির্বাচনকালীন সরকারের ব্যাপারে সংবিধানের ৫৫(১) অনুচ্ছেদে ও ৫৬ অনুচ্ছেদের (২) উপ-অনুচ্ছেদের শর্তাংশে বলা হয়েছে-বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধানে সহায়ক বা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কোনো কাঠামো নেই। পঞ্চদশ সংশোধনীর পর নির্বাচনকালীন সরকারের রূপ কী হবে, কারা মন্ত্রিসভায় থাকবেন বা থাকবেন না; তা নির্ধারণের একমাত্র অধিকার প্রধানমন্ত্রীর।
একইভাবে সংবিধানের ১২৩(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মেয়াদ অবসানের আগে সংসদ ভেঙে দেওয়ার এখতিয়ার কারো নেই বলেও জানিয়েছেন সংবিধান বিশেষজ্ঞরা। এই বিধানের কারণে সংসদ বহাল রেখেই নির্বাচন কমিশনকে আরেকটি সংসদ নির্বাচন করতে হবে। তবে ওই সময় সংসদের অধিবেশন বসবে না।
এমনকি নির্বাচনের আগে বিএনপি প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের যে দাবি করেছে, সংবিধানে এ ব্যাপারে কোনো নির্দেশনা নেই বলেও জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এ ব্যাপারে সংবিধানে বলা আছে, বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে সংসদের মেয়াদ শেষের ৯০ দিনের মধ্যে। ফলে সরকারের পদত্যাগের প্রশ্ন ওঠে না। কোনো কারণে যদি প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগও করেন তাহলেও সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ আস্থাভাজন কাউকে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেবেন।
তবে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নির্বাচনী পরিবেশকে সমঝোতামূলক করতে দরকার রাজনীতিবিদদের সদিচ্ছা। সংসদের বাইরের দল বিএনপি দুর্বল অবস্থানে আছে। তারা নির্বাচনের ব্যাপারে সমঝোতা চাইছে বলে মনে হচ্ছে। সরকারি দলকেও চাইতে হবে। বর্তমানের পরিবেশকে আরো সুন্দর করতেও তা দরকার। রাজনীতিবিদরা চাইলে পরিবেশ আরো সুন্দর হবে, তারা না চাইলে পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে হবে বলে আমি মনে করি। তখন আমরা আরো সংকটের দিকে এগিয়ে যাব। আশা করি, সব দলের রাজনীতিবিদের মধ্যে এ বোধোদয় ঘটবে।
লেখকঃ প্রতীক ইজাজ