Friday, June 2, 2017

ভালোমন্দ

সংযমের মাসে অসংযমী বণিক

রোজা শুরুর আগেই আরেক দফা বেড়েছে ভোগ্যপণ্যের দাম। রোজার অন্যতম খাদ্যসামগ্রী চিনি, ছোলা, বেসন, বেগুন, লেবু, শসা ও খেজুরের চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দামও বেড়েছে বেসামালভাবে। মসলাজাতীয় পণ্য রসুনের দাম সর্বকালের রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। বেড়েছে আদার দাম। তা ছাড়া ভোজ্য তেল, চাল, ডাল, আটাসহ অন্য সব ভোগ্যপণ্য বিক্রি হচ্ছে আগের চেয়ে বেশি দামে। সিটি করপোরেশনের বেঁধে দেওয়া দামের চেয়ে বেশি মূল্যে বিক্রি হচ্ছে গরু ও খাসির মাংস। বেড়েছে বিভিন্ন জাতের মাছের দাম। সেই সঙ্গে যেন পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ইফতার আইটেমের দাম। চলে আসা ধারাবাহিকতায় দেখা যাচ্ছে, রোজার মাস মানেই বাড়তি বাণিজ্যের মাস।
মন্তব্য: আমাদের প্রিয় নবীজি হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘জনগণের জীবিকা সংকীর্ণ করে যে ব্যক্তি খাদ্যদ্রব্য গুদামজাত করে, সে অপরাধী। আর জেনে রাখো, সে গুনাহগার সাব্যস্ত হবে।’ (মুসলিম শরিফ, হাদিস : ১৬০৫)। অপর এক হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি আমদানি করবে, সে রিজিকপ্রাপ্ত হবে, আর যে ব্যক্তি গুদামজাত করবে, সে অভিশপ্ত হবে।’ আশ্চর্য লাগে বাংলাদেশ একটি মুসলিমপ্রধান দেশ! পৃথিবীর মুসলিমপ্রধান দেশগুলোতে রমজান মাস মানেই মূল্যছাড়ের মাস। রোজাদার মুসলমানদের যাতে কোনো প্রকার কষ্ট না হয়, সেজন্য সেসব দেশের ব্যবসায়ীরা রোজার সব খাদ্য উপকরণসহ ইফতার আইটেমে অবিশ্বাস্য মূল্য ছাড় দিয়ে থাকেন। একেই বলা হয় সংযম। যদিও বাঙালি বণিকরা রোজার মাসকে অধিক মুনাফা অর্জনের মাস হিসেবে রোজাদার মানুষের ওপর উচ্চ লাভের যমদূতকে চাপিয়ে দেন। ভাবতে অবাক লাগে এই দেশেই ধর্ম অবমাননা বা স্বেচ্ছাচারিতা নিয়ে তুখোড় আন্দোলনে নামেন ইসলামী দল, সংগঠনসহ ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা। বুঝতে কষ্ট হয় মহিমান্বিত এই রমজানের ভাবার্থ সংযমকে মজুদদারি, মূল্যবৃদ্ধি এবং ভেজালের মাধ্যমে অবমাননা করা হলেও সবাই এ বিষয়ে নিশ্চুপ থাকেন। কিন্তু কেন? এ দেশে এটি কাম্য হতে পারে না। এ বিষয়ে সরকার, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ধর্ম মন্ত্রলায়, টিসিবি মিলে আগামী বছর রোজার আগেই কঠোর আইন, বাধ্যকরণ, শাস্তি নিশ্চিতকরণ, মজুদদারি বন্ধ করা, ভেজাল বন্ধ করা সর্বোপরি এ বিষয়ে ব্যাপক জনমত ও জনসচেতনতা সৃষ্টির পদক্ষেপ নেবেন-এটাই প্রত্যাশিত।
ব্যাংকে রাখলে টাকা পকেট হবে ফাঁকা: একজন ব্যাংকার হিসাব করে দেখেছেন যে, সরকারি ব্যাংকে কেউ এক লাখ টাকা তিন মাস মেয়াদে এফডিআর করলে উৎস কর ও আবগারি শুল্ক কেটে নেওয়ার পর গ্রাহক ফেরত পাবে ৯৯ হাজার ৯৫৬ টাকা।
জুলাই থেকে সরকার আমানতের ওপর আবগারি শুল্ক বসাবে এমন খবরেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে আমানতে। এ ছাড়া আগামী অর্থবছরে সঞ্চয়পত্রের সুদের হারও কমানো হচ্ছে বলে বলেছেন অর্থমন্ত্রী। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে ব্যাংকের সামগ্রিক আমানতের প্রবৃদ্ধির হার ৫ দশমিক ৬৩ শতাংশে নেমেছে; যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১৩ দশমিক ১২ শতাংশ। জুলাই থেকে ব্যাংকে স্থায়ী আমানতের ওপর আবগারি শুল্ক বসানোর সরকারি সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আবগারি শুল্ক বসালে আমানতে ধস নামবে। একজন ব্যাংকার হিসাব করে দেখছেন যে, আবগারি শুল্ক বসানোর পর স্থায়ী আমানতে গ্রাহকের মুনাফা তো হবেই না, বরং আরো লোকসান হবে। যেমন এক লাখ টাকার ওপর থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত আবগারি শুল্ক (এক্সাইজ ডিউটি) ধরা হচ্ছে এক হাজার টাকা। সরকারি ব্যাংকে কেউ এক লাখ টাকা তিন মাস মেয়াদে এফডিআর করলে মেয়াদ শেষে সাড়ে ৪ শতাংশ হারে (বেসরকারি ব্যাংকের ক্ষেত্রে সুদ ১ শতাংশের মতো বেশি) সুদ পাবেন ১ হাজার ১২৫ টাকা। উৎস কর হিসাবে এর ১৫ শতাংশ (১৬৯ টাকা) কেটে নেওয়া হবে। আর আবগারি শুল্ক হিসেবে কাটা যাবে ১ হাজার টাকা। অর্থাৎ মোট ১ হাজার ১৬৯ টাকা কেটে নেওয়া হবে। এতে তিন মাস পরে গ্রাহক ফেরত পাবে ৯৯ হাজার ৯৫৬ টাকা। অর্থাৎ তিন মাস টাকা খাটানোর পর লাভের পরিবর্তে নিজের আসল টাকা থেকেই কম পাবেন গ্রাহক।
মন্তব্য: মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা ছাড়া একে আর কী বলা যায়! এমনিতেই ব্যাংক ছাড়া মধ্যবিত্তের সামান্য সঞ্চয় বিনিয়োগের তেমন কোনো নিরাপদ ক্ষেত্র নেই। আমাদের সীমিত সঞ্চয় খাত হলো ব্যাংকে আমানত, সঞ্চয়পত্র আর পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ। এমনিতেই সঞ্চয়ের সুদহার দফায় দফায় কমানো হচ্ছে। এর ফলে ব্যাংকে আমানত অস্বাভাবিক হারে কমছে। সুদের হার কমায় আমানতকারীরা এখন আর ব্যাংকে টাকা রাখতে উৎসাহী হচ্ছেন না। মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য এটি দুঃসংবাদ। সরকারের বিষয়টি পুনর্বিবেচনায় নেওয়া উচিত। এসব পদ্ধতি উন্নত দেশের জন্য প্রযোজ্য-কারণ সেসব দেশে জনগণের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পুঁজিকে ব্যাংকে অলস পড়ে থাকতে দেওয়া হয় না। তবে তারা জনগণের পুঁজি বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। আমাদের দেশে ব্যাংকের টাকা ঋণখেলাপির নামে লুটপাট হয়। বেসরকারি ক্ষেত্রে আমানত বা বিনিয়োগে নিরাপদ, নির্ভরশীল কোনো ক্ষেত্র নেই। তাই সরকারের উচিত দেশের উন্নয়নের ধারাবাহিকতার সঙ্গে সমন্বয় রেখে ধীরালয়ে বা পর্যায়ক্রমে আবগারির মতোন পদক্ষেপকে সহনীয় করে তোলা। অর্থনীতিবিদদের ধারণা, সরকার হয়তোবা চাইছেন আবগারি শুল্ক বসানো হলে ব্যাংকে টাকা রাখার চাইতে মানুষ ভোগে বেশি ব্যয় করবে। তাতে হয়তো ভোগব্যয় বাড়ার কারণে অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। উন্নত দেশ কিংবা আমাদের দেশের উচ্চবিত্তের জন্য এই ধারণা সঠিক মনে হলেও সত্যিকার অর্থে এ দেশে মধ্যবিত্ত সমাজ কোণঠাসা হয়ে পড়বে। আমাদের সামাজিক ও অর্থনীতির চালিকাশক্তির মেরুদন্ড হচ্ছে মধ্যবিত্ত সমাজ। এখন সরকারকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, মধ্যবিত্ত সমাজকে বাঁচাবেন? নাকি! সামাজিক অর্থনীতির চাকাকে পেছন দিকে ঘুরাবেন?
বিদ্যুৎ ও সাক্ষরতায় উন্নতি: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) মনিটরিং দ্য সিচুয়েশন অব ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস অব বাংলাদেশ-২০১৬ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে দেশের ৮১ দশমিক ২ শতাংশ পরিবার বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছে। বিদ্যুৎ সুবিধার সম্প্রসারণ হলেও দেশের ১৩ শতাংশ মানুষ এখনো কেরোসিন বাতির ওপর নির্ভরশীল। সৌরশক্তির আলো জ্বলে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষের ঘরে। বেড়েছে বয়স্ক শিক্ষার হার। ১৫ বছর ও তদূর্ধ্ব জনসংখ্যার শিক্ষার হার ৭২ দশমিক ৩ শতাংশ। তবে সাত বছর ও তদূর্ধ্ব জনসংখ্যার মধ্যে শিক্ষার হার ৭১ শতাংশ। প্রতিবেদন মতে, চলতি বছরের জানুয়ারিতে দেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ১৭ লাখ ৫০ হাজারে দাঁড়িয়েছে। ২ হাজার ১২টি নমুনা এলাকার ২ লাখ ২০ হাজার ৮৭২টি খানার তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২০১৭ সালের ১ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশের মোট প্রাক্কলিত জনসংখ্যা ১৬ কোটি ১৭ লাখ ৫০ হাজার। এর মধ্যে পুরুষ ৮ কোটি ১০ লাখ ও নারী ৮ কোটি ৭৫ হাজার। মোট জনসংখ্যার মধ্যে ৮৮ দশমিক ৪ শতাংশ ইসলাম ধর্মাবলম্বী। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১ দশমিক ৩৭ শতাংশ। মোট জনসংখ্যার মধ্যে ৩০ দশমিক ৮ শতাংশের বয়স ১৫ বছরের নিচে। বেড়েছে প্রত্যাশিত আয়ুষ্কাল ৭১ দশমিক ৬ বছর। এর মধ্যে পুরুষের তুলনায় নারীদের গড় আয়ু বেশি বেড়েছে।
মন্তব্য: খবরগুলো ভালো। সরকারি সব প্রচেষ্টার বাস্তব অবস্থার প্রতিফলন বটে। তবে যদিও সরকারের বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্র অনেক ঊর্ধ্বে, সেজন্য স্থায়ী বিদ্যুতায়নে সঞ্চালন লাইন ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অসততা, দুর্নীতি বন্ধ করা, প্রশিক্ষণ, অবৈধ বিদ্যুৎ লাইন কাটা, ভৌতিক বিল থেকে জনগণকে রেহাই দেওয়াসহ বিদ্যুৎ চুরি, অবচয় এবং পরিমিত ব্যবহারে ব্যাপক জনসচেতনতা ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। শিক্ষায় সাক্ষরতার হার বাড়লেও কর্মমুখী শিক্ষার বিস্তার লাভ না করায় যোগ্যতাভিত্তিক সবার জন্য কর্মসংস্থান নিশ্চিত হচ্ছে না। এ বিষয়ে সরকারের মনোযোগ দিতে হবে। শিক্ষার বিভিন্ন স্তরভিত্তিক কর্মসংস্থান নিশ্চিত হলে প্রকৃতঅর্থে শিক্ষার হারের সুফল পাবে দেশ। সেসঙ্গে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার নিয়ন্ত্রণ এবং ১৫-২৫ বছর বয়সী তরুণশক্তি প্রায় ৫০ ভাগকে দ্রুততম সময়ে কাজে লাগাতে হবে। পাশাপাশি আয়ু বৃদ্ধির ফলে বয়স্ক লোকের সংখ্যা যে ক্রমেই বাড়বে তাদের ভরণপোষণ নিরাপত্তার বিষয়টি আগে থেকে ভাবতে হবে। যাতে একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ ৬০ বছর থেকে ৭০ বছরেও কম পরিশ্রমে উৎপাদনমুখী কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে পারেন। তাহলেই সার্বিক উন্নয়নের চাকা গতিশীল হবে।

Thursday, June 1, 2017

ব্যাংকে লাখ টাকার বেশি থাকলেই বাড়তি কর?

৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকার

বিশাল ব্যয়ের সর্ববৃহৎ বাজেট!

বাজেটে শেষ পর্যন্ত বহুল আলোচিত ১৫ শতাংশ ভ্যাটই রাখা হয়েছে। মোট ব্যয় মেটাতে নির্ভর করা হয়েছে বিভিন্ন ধরনের করের ওপর। সিংহভাগই আসবে রাজস্ব খাত থেকে। ফলে করের বোঝা বাড়ছে। কর দিতে উৎসাহিত করতে ‘কর বাহাদুর পরিবার’ ঘোষণার প্রস্তাব এসেছে। প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়েছে। কর কাঠামো একই থাকছে। ঘাটতি মেটাতে সঞ্চয়পত্র থেকে বেশি ঋণ নিতে যাচ্ছে সরকার। গড় মূল্যস্ফীতি নামিয়ে আনার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে। রেন্টাল বিদ্যুৎ থেকে সরে আসার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। সর্বোচ্চ বরাদ্দ পেয়েছে মানবসম্পদ খাত। বিমানের টিকিটে দ্বিগুণ শুল্ক বসছে। পরিবর্তন এসেছে পেনশন ব্যবস্থাপনায়। ঘাটতি গত বছরের তুলনায় বেড়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের মাসিক ভাতার সঙ্গে দুটি উৎসব ভাতা যুক্ত করা হচ্ছে।

এ ছাড়া বাজেট বক্তৃতায় উচ্চ প্রবৃদ্ধির জন্য সঞ্চয় ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেন অর্থমন্ত্রী। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বিনিয়োগকে ৩১ দশমিক নয় শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা তুলে ধরেন। এ ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতে ২৩ দশমিক তিন শতাংশ এবং সরকারি বিনিয়োগ আট দশমিক ছয় শতাংশে উন্নীত করার কথা বলেন।
বাজেট নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে প্রতিক্রিয়া এসেছে। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ‘লুটপাটের বাজেট ও বাস্তবায়নযোগ্য নয়’ বলে মন্তব্য করেছেন। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিসহ বিভিন্ন বাম রাজনৈতিক দল বাজেটকে ‘গরিব মারার বাজেট’ হিসেবে উল্লেখ করে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মানববন্ধনের ডাক দিয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদরা মোটা দাগে এ বাজেটের কারণে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা করেছেন। তবে সতর্ক থাকলে এ বাজেট বাস্তবায়ন করা সম্ভব বলেও মত দিয়েছেন তারা।
প্রস্তাবিত বাজেট দেশের মোট জিডিপির ১৮ শতাংশ। বিদায়ী বাজেট ছিল জিডিপির ১৭ দশমিক ৩৭ শতাংশ। বিশাল এই বাজেটের প্রায় ৭২ শতাংশ অর্থ রাজস্ব খাত থেকে আদায়ের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। গতবারের মতো এবারও সবচেয়ে বেশি কর আদায়ের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট থেকে; ৯১ হাজার ২৫৪ কোটি টাকা। এই অঙ্ক বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ৩৩ শতাংশের মতো। বিদায়ী অর্থবছরের বাজেটে ভ্যাট থেকে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা ছিল ৭২ হাজার ৭৬৪ কোটি টাকা। লক্ষ্য পূরণ না হওয়ায় সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ৬৮ হাজার ৬৭৫ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়।
প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে দুই লাখ ৮৭ হাজার ৯৯১ কোটি টাকা। বিদায়ী মূল বাজেটে মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছিল দুই লাখ ৪২ হাজার ৭৫২ কোটি টাকা। কিন্তু শেষপর্যন্ত সংশোধন করে দুই লাখ ১৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়। আয়কর ও মুনাফার ওপর কর থেকে ৮৫ হাজার ১৭৬ কোটি টাকা রাজস্ব পাওয়ার আশা করা হয়েছে এবারের বাজেটে। বিদায়ী বাজেটে এর পরিমাণ ছিল ৭১ হাজার ৯৪০ কোটি টাকা। এ ছাড়া আমদানি শুল্ক থেকে ৩০ হাজার ২৩ কোটি টাকা, সম্পূরক শুল্ক থেকে ৩৮ হাজার ৪০১ কোটি টাকা, রফতানি শুল্ক থেকে ৪৪ কোটি টাকা, আবগারি শুল্ক থেকে এক হাজার ৫৯৯ কোটি টাকা এবং অন্যান্য কর ও শুল্ক থেকে এক হাজার ৬৯০ কোটি টাকা আদায়ের পরিকল্পনা করেছেন অর্থমন্ত্রী।

বাজেট ২০১৭-১৮

দাম কমছে যেসব পণ্যের

প্রস্তাবিত ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণা করছেন অর্থমন্ত্রী। এবারের বাজেটে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করায় জনমনে প্রশ্ন ওঠেছে যে বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়বে। তবে অর্থমন্ত্রী তা নাকচ করেছেন।
দাম যেন না বাড়ে সেজন্য বেশ কিছু পণ্যে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। সেগুলো হলো, প্যাকেটকৃত তরল দুধ, পনির, মাঠা; পাখির ডিম, মধু, আলু, টমেটো, পেঁয়াজ, শ্যালট, রসুন, লিকস এবং অন্যান্য এ জাতীয় শাকসবজি; বাঁধাকপি, ফুলকপি, মাথাযুক্ত ব্রকলি, কোহিলাভি, কেইল; লেটুস, চিকোরি, গাজর, শালগম, সালাদ বিটমুল, স্যালসিফাই, সেলেরিয়াক, মুলা, শিম্বারকার শাকসবজি, সব ধরনের শাকসবজি, নারিকেল, কাজু বাদাম, সুপারিসহ ৫৪৯টি পণ্য।
সব প্রকার কলা, খেজুর, ডুমুর, আনারস, পেয়ারা, আম, গাব, লেবুজাত ফল, আঙ্গুর, তরমুজ, আপেল, নাশপাতিসহ যেকোনো ফল; গোল মরিচ, ভ্যানিলা, দারুচিনি, লবঙ্গ, জায়ফল, জৈত্রী, এলাচী, মৌরী, ফেনেল, ধনিয়া, জিরা, আদা, জাফনার, হলুদ, তেজপাতা, কারি, মসলা, গম, মেসলিন; রাই, বার্লি, জই, ভুট্টা, ধান, সব ধরনের চাল, মুড়ি, সোরঘাম শস্য, বাজরা, ক্যানারাই বীজ। ময়দা, আটা, চাল, গম, ভুট্টার তৈরি সুজি, সয়াবিন। চীনা বাদাম, তিসি, স্বর্ষপ, সূর্যমুখী ফুলের বীজ, অন্যান্য তেল, লেকোস্ট সীম, সামুদ্রিক আগাছা এবং অন্যান্য সমুদ্র শৈবাল, আখ, চালের কুড়ার তেল, চিনি ও আঁখের গুড়, চোলাইন, সব ধরনের লবন ইত্যাদি।
এর ফলে সাধারণ মানুষের জীবনকে নতুন মূসক কোনোভাবেই প্রভাবিত করবে না। দেশের অভ্যন্তরে সব অস্থায়ী হোটেল, রেস্তোঁরায় খাদ্য দ্রব্য সরবরাহে মূসক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। সাধারণ মানুষ যেসব হোটেল, রেস্তোঁরায় খাওয়া দাওয়া করে তাতেও মূসক দিতে হবে না। ফলে এসব হোটেলে খেলে খরচ বাড়বে না।
কৃষি কাজে ব্যবহৃত সব উপকরণ যেমন বীজ, সব প্রকার সেচ সেবা, বীজ সংরক্ষণ সেবা, মৎস্য, জলজপ্রাণী ও জলজ সম্পদ আহরণ ও সংরক্ষণ সংক্রান্ত সেবা, সব প্রকার সার, কীটনাশক, যন্ত্রপাতি ইত্যাদিতে মূসক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। ডেইরি, ফাউন্ড্রি, পাটশিল্পের কাজে ব্যবহৃত সব যন্ত্রপাতিতে মূসক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। খালি জমি বিক্রয়, হাইটেক পার্ক ও অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানে পণ্য উৎপাদন পর্যায়ে মূসক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। সরকারের ফাস্ট ট্রেক তালিকাভুক্ত সব প্রকল্পে সরবরাহ, নির্মাণ, ইন্টারনেট ইত্যাদি সেবাকে মূসক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
পিপিপি’র আওতাভুক্ত সব প্রকল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদনে কিছু প্রকল্পে মূসক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। সব ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, রেডিও ও টেলিভিশনে সম্প্রচার, শিল্পকর্ম, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, অপেশাদারী খেলাধুলা, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, লাইব্রেরি, সব প্রকার জাদুঘর, আর্টগ্যালারি, চিড়িয়াখানা, বোটানিক্যাল গার্ডেনে প্রবেশ মূল্য, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনকারী প্রতিষ্ঠান, শ্যুটিং ক্লাব, সব সামাজিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও খেলাধুলা, কৃষি পণ্য, উদ্যান বা পশু-পাখির মেলায় প্রবেশ মূল্য, ব্যাংকিং ও বীমা খাতের কমিশন ব্যতীত সব বিষয় (ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আমানত, সঞ্চয়), জীবন বীমা ও অগ্নি বীমা, স্টক মার্কেট ও তার সব কাজ, কম্পিউটার ও কম্পিউটার যন্ত্রাংশে মূসক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। দেশে উৎপাদিত এলপিজি সিলিন্ডার, ফ্রিজ, টিভি, এসি ও মোটরসাইকেলে ২০১৯ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত অব্যাহতি দেওয়া আছে, তা বলবৎ থাকবে। দেশীয় সফটওয়্যার উৎপাদন ও সরবরাহে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
জীবন্ত গবাদি পশুসমূহ এবং জীবন্ত পশু-পাখিসমূহ। আড়াই কেজি পর্যন্ত গবাদি পশুর মাংস, শুকরের মাংস, ভেড়া বা ছাগলের মাংস, ঘোড়া, গাধা, খচ্চরের মাংস, হাঁস মুরগির মাংস (টিনজাত ব্যতীত)। জীবন্ত মাছ, আড়াই কেজি পর্যন্ত তাজা, টিনজাত অথবা হিমায়িত মাছ। আড়াই কেজি পর্যন্ত মোড়ক বা টিনজাত ব্যতীত কাঁটা ছাড়ানো মাছ ও মাছের মাংস, শুকনা, লবণাক্ত মাছ। খোলসযুক্ত বা খোলস ছাড়ানো শামুক জাতীয় প্রাণী।
প্রোভিটামিনস ও ভিটামিন, সব প্রকার জন্ম নিরোধক, ভ্যাকসিন ফর হিউম্যান মেডিসিন, লিভার সিরোসিস, হেপাটাইটিস সি নিরাময়কারী, হোমিওপ্যাথিক, আয়ুবের্দিক, ইউনানী ও ভেষজ ওষুধ সামগ্রী, কিডনি ডায়ালাইসিস, ক্যান্সার নিরোধক ওষুধ, ম্যালেরিয়া নিরোধক ও কুষ্ঠরোধ নিরোধক ওষুধ, থেলাসেমিয়া, প্রাথমিক চিকিৎসার জিনিস। ২০-৩০ ধরনের মেডিকেল ইক্যুপমেন্ট, হাসপাতাল শয্যা।
দেশের মধ্যে (সরবরাহ) অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস, শীততাপ নিয়ন্ত্রিত যানবাহনের মাধ্যমে পরিবহন সেবা, ভাড়াকৃত পরিবহন ছাড়া ট্যাক্সি, বাস, মিনিবাস, লঞ্চ, স্টিমার, ফেরির মাধ্যমে পরিবহন সেবা। এয়ারলাইন্স (চার্টার্ড বিমান ও হেলিকপ্টার ভাড়া প্রদানকারী সংস্থা ব্যতীত), খাদ্য শস্য পরিবহনকারী পরিবহন সেবা।
সমাজকল্যাণমূলক কার্যক্রমকে মূসকের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। যেমন জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসা বা স্বাস্থ্যসেবা, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল ব্যতীত সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সব প্রশিক্ষণ (আগের আইনে শুধু সরকারি প্রশিক্ষণ মূসক অব্যাহতি ছিল), শিশু পালন কার্যক্রম, বয়স্ক, অক্ষম, দরিদ্র বা অক্ষম লোকদের আবাসিক সেবা (আগের আইনে অব্যাহতি ছিল না)। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা কার্যক্রমের জন্য পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ কার্যক্রমে (আগের আইনে ৫% ভ্যাট ছিল)।

বাজেট ২০১৭-১৮

দাম বাড়ছে যেসব পণ্যের

প্রস্তাবিত ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে বাজেট অনুযায়ী বেশ কিছু পণ্যের দাম বাড়ছে।
এগুলো হলো- মোবাইল সিম ও রিম কার্ড, টুথব্রাশ, মশার কয়েল, সাবান ও ডিটারজেন্ট, দিয়াশলাই, সবধরনের স্যুটকেস, সবধরনের প্লাস্টিক পণ্য, সব ধরনের কিসেন ওয়্যার, টেবিলওয়্যার, প্লাস্টিকের দরজ-জানলা, বৈদ্যুতিক ফ্যান ও ফ্যানের যন্ত্রাংশ, ফাস্টফুড, বেদেশি টিভি ও টিভির যন্ত্রাংশ।
এখন সংসদে অর্থমন্ত্রী বাজের পেশ করছেন। এবারের বাজেটের আকার হচ্ছে ৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকা।

প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৭.৪ শতাংশ

আগামী ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি ধরা হয়েছে ২২ লাখ কোটি টাকার বেশি। আর জিডিপির প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ। বৃহস্পতিবার দুপুরে জাতীয় সংসদে বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এ তথ্য জানান। চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছরের জন্য জিডিপি এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছিল যথাক্রমে ১৯ লাখ ৬১ হাজার ১৭ কোটি টাকা এবং ৭ দশমিক ২ শতাংশ।
বাজেট পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের তুলনায় আগামী অর্থবছরের বাজেটে জিডিপির আকার ১ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বেশি বাড়ানো হয়েছে।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে মন্ত্রিপরিষদ কক্ষে অনুষ্ঠিত বিশেষ বৈঠকে ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরের জন্য ৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকার বাজেট অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। একইসঙ্গে সম্পূরক অর্থবিল ২০১৭ এর অনুমোদনও দেওয়া হয়েছে।